বিশ্ব যখন সাধারণ নাগরিকদের জরুরি প্রস্তুতির ডাক দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নজর সামরিক ঘাঁটির সুরক্ষায়

সাইবার হামলা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ জরুরি পরিস্থিতিতে অপরিহার্য সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো সাধারণ মানুষকে প্রস্তুত থাকার আহ্বানে নতুন প্রচার চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে: সাধারণ জনগণের বদলে তাদের মনোযোগ সামরিক প্রস্তুতিতে।
যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ 'বি রেডি' প্রচার জনগণকে ৭২ ঘণ্টা চলার মতো সরবরাহ মজুত রাখার আহ্বান জানাচ্ছে। জলবায়ু সংকটের প্রভাব, প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের হুমকি নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যেই এই সতর্কবার্তা এসেছে।
সুইডেনও সম্প্রতি 'সংকট বা যুদ্ধ' পরিস্থিতির জন্য জনগণের উদ্দেশে হালনাগাদ নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। জাপানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী গোশি হোসোনো বলেছেন, দেশটির নতুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার কার্যক্রম শুরু হওয়ার দিন ২ নভেম্বর নাগরিকদের উদ্দেশে জরুরি আহ্বান জানানো হবে। সেই পরিকল্পনায় যুক্তরাজ্যের পরামর্শের প্রতিধ্বনিই থাকবে বলে জানা গেছে—দুর্যোগের সময় পরিবারগুলোকে অন্তত তিন দিন স্বনির্ভর থাকার মতো সরবরাহ রাখতে হবে।
সুইডেনের নাগরিক প্রতিরক্ষা ও সহনশীলতা সংস্থা লিখেছে, 'সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের অবস্থার তীব্র অবনতি ঘটেছে। আমাদের আশপাশেই যুদ্ধ চলছে। চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে। আমাদের দুর্বল ও প্রভাবিত করতে সন্ত্রাসী হুমকি, সাইবার হামলা এবং অপতথ্য প্রচার ব্যবহার করা হচ্ছে।'
অন্যদিকে ৩০ সেপ্টেম্বর পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রকাশ করেন পিট হেগসেথ, যাতে 'ফোর্ট্রেস আমেরিকা' নামের উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে বাইরের সহায়তা ছাড়াই অন্তত ৯০ দিন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করা। স্মারক অনুযায়ী উদ্যোগটি পাঁচটি স্তম্ভের ওপর গড়া: জ্বালানি স্বাধীনতা; সরবরাহ শৃঙ্খল ও প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তির সহনশীলতা; একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা মজুত; স্থাপনা শক্তিশালীকরণ ও সাইবার সহনশীলতা; এবং মহাকাশ ও তরঙ্গ পরিসরে সহনশীলতা।
ন্যাশনাল ইমারজেন্সি ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (নেমা) সাবেক সভাপতি এবং ওয়াইয়োমিংয়ের স্বদেশি নিরাপত্তা দপ্তরের বর্তমান পরিচালক লিন বাড মনে করেন, সাইবার হামলা ক্রমেই শক্তিশালী হুমকি হয়ে উঠছে—নেতাদের মধ্যে এ নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। তিনি বলেন, 'আমাদের বিশ্ব খুব ছোট হয়ে গেছে, আর হুমকিগুলো আসন্ন।'
বাড প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের যুগ্ম হুমকির কথাও তুলে ধরেছেন, যেমন টর্নেডোর মাঝখানে একটি সাইবার হামলা চালানো। তিনি বলেন, সবার মনোযোগ যখন টর্নেডোর দিকে, প্রতিপক্ষ সেই সময়টারই সুযোগ নিয়ে সাইবার হামলা বা অন্য ধরনের আক্রমণ চালাতে পারে, যা কোনো সম্প্রদায়ের জরুরি অবকাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে।
অন্যদিকে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি কেন্দ্রের পরিচালক ড. টম চ্যান্ডলার যুক্তি দিয়েছেন, পেন্টাগনের পরিকল্পনা ব্যক্তিগত প্রস্তুতি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির প্রয়োজনের বিশাল পার্থক্যটাই তুলে ধরে। তিনি বলেন, এটি শুধু স্বল্পমেয়াদি জরুরি পরিস্থিতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্নের জন্য পরিকল্পনার গুরুত্বকেই সামনে আনে; যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিচালন দায়িত্ব সাধারণ পরিবারের প্রয়োজন থেকে প্রায়ই একেবারেই আলাদা।
এফবিআইয়ের সাইবার বিভাগের সাবেক সহকারী পরিচালক এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান লেভেলব্লুর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জেমস ট্রেনর বলেন, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে অব্যাহত প্রচার দুর্যোগ প্রস্তুতির উদ্যোগে এর ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকেই প্রতিফলিত করে। তাঁর ভাষ্যে, সাইবার সমস্যা কখনো ছোট হয় না; আরও তথ্য, আরও সংযোগ এবং খারাপ পক্ষের আরও উদ্ভাবন আসছে, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এই সরঞ্জামগুলো দুর্বলতা খুঁজে বের করা ও কাজে লাগানোর গতি বাড়িয়ে দেবে—ঝুঁকি শুধু বাড়তেই থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তিগত জরুরি প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রে পিছিয়ে আছে। ইউনিভার্সিটি অ্যাট অ্যালবানির জরুরি ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. ডিডি বেনেট গেইল বলেন, 'আমাদের বেশি সাধারণ বিপদগুলোর জন্য প্রস্তুতির মাত্রা যেখানে থাকা উচিত, সেখানে নেই।' ফেমার ২০২৪ সালের জাতীয় প্রস্তুতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক বিশ্বাস করতেন তারা একটি দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের প্রচারের মতোই একটি কর্মসূচি রয়েছে—রেডি ডট গভ—যা ২০০৩ সালে চালু হয় এবং স্বদেশি নিরাপত্তা বিভাগ এটি পরিচালনা করে। সরকারি ওয়েবসাইটটিতে বন্যা, দাবানল, সাইবার নিরাপত্তা, ভূমিকম্প ও বিস্ফোরণসহ ২৫ ধরনের দুর্যোগের কথা উল্লেখ আছে।
চ্যান্ডলার স্বীকার করেছেন, অন্য দেশগুলো জরুরি প্রস্তুতিতে বেশি কেন্দ্রীভূত পদ্ধতি নিলেও যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বহুস্তর ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেছে। তাঁর ভাষ্যে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থা শুরু থেকেই স্থানীয়ভাবে বাস্তবায়িত, রাজ্য দ্বারা পরিচালিত এবং ফেডারেলভাবে সমর্থিত কাঠামোতে গড়া। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ফেডারেল কর্মী ব্যাপক ছাঁটাই রাজ্য ও স্থানীয় সরকারগুলোর ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক একটি সরকারি হিসাব দপ্তরের (জিএও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৩০০ জনের বেশি কর্মী ফেমা ছেড়েছেন, যা মোট কর্মীর প্রায় ১৭ শতাংশ।




