পথশিশুদের পাঠদান থেকে রক্তদান: নগরবাসীর পাশে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

বহুতল ভবন, যানবাহনের কোলাহল আর কংক্রিটের বিস্তারের মাঝে সবুজে ঘেরা শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) কৃষি গবেষণা ও ব্যবহারিক শিক্ষার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশেও কাজ করছে। পথশিশুদের পাঠদান, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সহায়তা ও জরুরি রক্তদানের মতো উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বিশ্ববিদ্যালয়টির ভূমিকা আরও বিস্তৃত করেছে।
দেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তায় অবদান রাখার পাশাপাশি নগরজীবনেও বহুমুখী ভূমিকা রাখছে শেকৃবি। গবেষণা ও শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার্থীরা যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে মানুষের পাশে দাঁড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে গড়ে উঠছে প্রকৃতি ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল প্রজন্ম।
কৃষি গবেষণায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। শেকৃবির প্রায় ১৪ একরের কেন্দ্রীয় গবেষণা খামারে প্রতিবছর বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা ৩০০টির বেশি গবেষণা পরীক্ষা পরিচালনা করেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রয়েছে ডেইরি, পোলট্রি ও মৎস্য খামার, নার্সারি এবং মিনি জু, যেখানে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পান।
নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির উন্নয়নে এসব গবেষণা ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি নগর কৃষি, ছাদবাগান ও পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয়টির জ্ঞান ও গবেষণা নগরবাসীর কাজে আসতে পারে।
শিক্ষার্থীদের মানবিক কার্যক্রমের অন্যতম উদাহরণ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আলোকিত মানুষ’। ২০১৯ সালের ২ এপ্রিল যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে কাজ করছে। প্রতি শুক্রবার ও শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো অ্যাগ্রিবিজনেস ফ্যাকাল্টি প্রাঙ্গণে শিশুদের পাঠদান করেন স্বেচ্ছাসেবকেরা।
রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে বসবাসকারী শিশু, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ক্যান্টিন ও ডাইনিংয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সন্তান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানেরাও এই কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে। পাঠশালাটিতে প্রায় ৫০ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী এবং ১০ জন নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক রয়েছেন। শিশুদের শিক্ষার পাশাপাশি শীতার্তদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ, রমজানে ইফতার ও ঈদসামগ্রী বিতরণসহ বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগও পরিচালনা করছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির সভাপতি মো. সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘আলোকিত মানুষ’ সবসময় মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে আসছে। তাঁর ভাষ্য, সংগঠনটির মূল লক্ষ্য হলো সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা, এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
হাসপাতালের রোগীদের রক্তের চাহিদা মেটাতেও কাজ করছেন শেকৃবির শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর শেরেবাংলা নগর ও আশপাশের এলাকায় রয়েছে প্রায় ১০টি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগীর জরুরিভাবে রক্তের প্রয়োজন হয়, আর তাদের একাংশের রক্তের চাহিদা পূরণে কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সংগঠন ‘বাঁধন’-এর শেকৃবি ইউনিট।
বাঁধন শেকৃবি ইউনিটের সভাপতি অনিন্দ্য বিশ্বাস অর্ঘ্য বলেন, স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধন ১৯৯৭ সাল থেকে মানবসেবায় কাজ করে যাচ্ছে। অবস্থানগত কারণে শেকৃবি ইউনিটে রক্তের চাহিদা বরাবরই বেশি; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতি মাসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ব্যাগ রক্তদান করেন, যার সিংহভাগই যায় আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য। হাসপাতালগুলোর ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগে ইউনিটের যোগাযোগ নম্বর দেওয়া আছে, সেখান থেকে রোগীর স্বজনেরা যোগাযোগ করেন; অনেকে সরাসরি হলের গেটে এসেও শিক্ষার্থীদের রক্তদানের জন্য নিয়ে যান।
অনিন্দ্য বিশ্বাস অর্ঘ্য আরও বলেন, চাহিদার তুলনায় রক্তদাতার সংখ্যা সীমিত হওয়ায় সব সময় এই বিপুল চাহিদা পূরণ করা কঠিন, তবু তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যেন কোনো রোগীকে রক্তের প্রয়োজনে ফিরিয়ে দিতে না হয়। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরীতে শেকৃবির বৃক্ষরাজি, ফুলের বাগান, নার্সারি ও উন্মুক্ত সবুজ পরিসরও শিক্ষার্থী ও নগরবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


