ইরান যুদ্ধে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফা ১৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি, ঘরে ঘরে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় ১৫ হাজার কোটি
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো ১৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি মুনাফা করেছে, অথচ একই সময়ে সাধারণ ভোক্তাদের অনেক বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আবার লড়াই শুরু করতে পারেন—এমন আশঙ্কার মধ্যেই এই হিসাব সামনে এসেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রকাশিত হিসাবটিকে রক্ষণশীল মূল্যায়ন বলা হয়েছে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর—এই ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১টি বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানির কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে মুনাফার অঙ্কটি তৈরি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে, অর্থাৎ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগে তেলের দাম যখন কম ছিল, কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের কম আয় করেছিল।
অন্যদিকে ভোক্তাদের ব্যয়ের হিসাব দিয়েছে ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ক্লাইমেট সলিউশনস ল্যাব। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমেরিকানরা পেট্রোল ও ডিজেলে অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে—যা প্রতিটি পরিবারের হিসাবে ১ হাজার ১৫০ ডলারের বেশি।
কে লাভবান হচ্ছে আর কে যুদ্ধের মূল্য দিচ্ছে—তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জিম ম্যাকগভার্ন এক্সে লিখেছেন, ‘আমরা বিপুল ভাগ্য গড়ছি না, আমরা বিপুল অর্থ গুনছি।’
ইতালির মিলানে ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের (আইএসপিআই) ফেলো নাসের আল-তামিমি বলেছেন, মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো যুদ্ধ থেকে নানাভাবে লাভবান হয়েছে। তাঁর ভাষায়, অপরিশোধিত তেল উৎপাদকেরা বেশি দাম থেকে লাভ পাচ্ছে, আর ডিজেল ও অন্য জ্বালানির সরবরাহ সংকুচিত হওয়ায় পরিশোধনকারীরা ব্যতিক্রমী মুনাফা পাচ্ছে।
আল-তামিমি আরও বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার পরিশোধনাগারের ক্ষতি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত বাণিজ্য জটিলতা ঘাটতি আরও তীব্র করেছে। এর বিপরীতে তুলনামূলক নিরাপদ মার্কিন স্থাপনা এবং ছাড়মূল্যে অপরিশোধিত তেল পাওয়ার সুযোগ কোম্পানিগুলোর লাভ আরও শক্তিশালী করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুই তেল কোম্পানি এক্সনমোবিল ও শেভরন শুক্রবার ১ হাজার কোটি থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে মুনাফার কথা জানিয়েছে। তবে নিউইয়র্ক টাইমস দেখেছে, এই লাভ সাধারণত ২০২২ সালের মাত্রার নিচেই রয়েছে; সেবার ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে উঠেছিল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছিল, যেখানে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরে গড় দাম ছিল ৯০ ডলার।
পরিশোধন কোম্পানিগুলোর মুনাফাও বেড়েছে, কারণ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায় অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতিতে মজুত কমেছে। ভ্যালেরো এনার্জির তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফা ছয় গুণের বেশি বেড়ে ৬৮৩ কোটি ডলার হয়েছে। ফিলিপস ৬৬ ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রান্তিক মুনাফার কথা জানিয়েছে—এক বছর আগের ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে তাদের নিট আয় হয়েছে ৫৬২ কোটি ডলার।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গালফ স্টেটস ইনসাইটস নিউজলেটারের সম্পাদক জিওফ্রে মিলার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক তেল ও পরিশোধিত পণ্যের বাজারে সবচেয়ে বড় সরবরাহ-ধাক্কা তৈরি করেছে। তাঁর ভাষায়, এই যুদ্ধ এমন একটি ঝুঁকি-প্রিমিয়াম তৈরি করেছে, যা কাজে লাগানোর কাঠামোগত সুবিধা মার্কিন অপারেটরদের হাতে রয়েছে। বিপরীতে উপসাগরীয় উৎপাদকেরা বেশি খরচ ও ঝুঁকির পাশাপাশি সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছে, ফলে বেশি দাম থেকেও তাদের লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে তেহরান উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত স্বাধীন সংঘাত পর্যবেক্ষক এসিএলইডি জানিয়েছে, ইরান ও অঞ্চলটিতে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো ছয়টি জিসিসি সদস্য দেশে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর অন্তত ১৭২টি হামলা চালিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা বললেও হামলায় জ্বালানি অবকাঠামোও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।
ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি দিয়ে অধিকাংশ জাহাজের চলাচল বন্ধ করে দেয়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেল ও গ্যাসের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে। পাল্টাপাল্টি এই পদক্ষেপে গুরুত্বপূর্ণ এই পথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
জুনে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর গ্রীষ্মে তেলের দাম কিছুদিন কমলেও আলোচনা ভেঙে গেলে দাম আবার দ্রুত বেড়ে যায়। সৌদি আরবের সঙ্গে হুতিদের নতুন লড়াই সংকট আরও বাড়িয়েছে—লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্তকারী বাব আল-মান্দেব প্রণালি, যা দিয়ে সৌদি আরব তেল রপ্তানি করে, সেটিও এখন যুদ্ধের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
মিলার বলেছেন, স্বল্প মেয়াদে এই অতিরিক্ত মুনাফা শুধু তেল কোম্পানিগুলোর হিসাব ও শেয়ারধারকদের লভ্যাংশই শক্তিশালী করবে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, দীর্ঘ মেয়াদে বেশি তেলের দাম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, এমনকি মন্দার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—যা শেষ পর্যন্ত তেলের চাহিদা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাত্রা ত্বরান্বিত করতে পারে।
লন্ডনে রাবোব্যাংকের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাজার দলের জ্যেষ্ঠ জ্বালানি কৌশলবিদ ফ্লোরেন্স শমিট আল জাজিরাকে বলেছেন, ইরান যুদ্ধ কত দিন চলবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় মূল জ্বালানি পণ্যের দাম বেশি থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব বাজার এই বৈশ্বিক সরবরাহ-ধাক্কার মুখে রয়েছে, সেখানে আগামী বছরও দাম বেশি থাকবে এবং সরকারগুলো পদক্ষেপ না নিলে ভোক্তাদের ওপর এই চাপ চলতেই থাকবে।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানিতে থেমে নেই। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সর্বশেষ কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক অনুযায়ী, এ বছর পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ বাড়তে চলেছে; শস্য পরিবহনে বিঘ্ন এবং এল নিনো আবহাওয়াও ফসল ও খাদ্যের সাশ্রয়কে হুমকিতে ফেলছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ২ অক্টোবর জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে বিশ্ব খাদ্যপণ্যের দাম আরও ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে—আগস্টে তা ২০২২ সালের শেষ দিকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল; প্রতিকূল আবহাওয়া এবং কৃষ্ণসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্য বিঘ্নকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্প বেশি বৈশ্বিক জ্বালানি দামের জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন এবং রুশ পরিশোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর চাপ দিয়েছেন, যদিও মস্কো ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুক্তি দিয়েছেন, বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা উল্টে রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি হলে ডিজেলের দাম কমাতে সাহায্য হবে।
উপসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে আল-তামিমি বলেছেন, যেসব রপ্তানিকারক চালান ধরে রাখতে পারবে, বেশি দাম তাদের লাভ দেবে; কিন্তু দীর্ঘ অনিরাপত্তা সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা ও বিনিয়োগকে হুমকিতে ফেলতে থাকবে। তাঁর ভাষায়, উপসাগরীয় উৎপাদকদের সামনে রয়েছে বছরের পর বছর পুনর্গঠন এবং রপ্তানি পথ বৈচিত্র্যময় করার চাপ; একটি কূটনৈতিক সমঝোতা দাম কমাতে পারে, আর ইরানে নতুন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা আরেকটি আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করে হরমুজে বিঘ্ন আরও দীর্ঘ করতে পারে।



