মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইসলামবিদ্বেষের বাড়বাড়ন্ত: টেক্সাসের মুসলিম ভোটারদের চোখ স্থানীয় হিসাবেই
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের শেষ ধাপজুড়ে বাড়তে থাকা ইসলামবিদ্বেষ ছায়া ফেলেছে। এই বিদ্বেষের কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন মুসলিম প্রার্থীরা, যেমন মিশিগানের ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রত্যাশী আবদুল এল-সায়েদ। তবে মুসলিম ভোটাররা বলছেন, এই পরিস্থিতি টেক্সাসে বহু বছর ধরে তৈরি হচ্ছিল, যেখানে রাজ্যের রাজনীতিকেরা এমন বক্তব্য ও নীতি চালিয়ে এসেছেন যা তাঁদের অস্তিত্বকেই কলঙ্কিত করে।
টেক্সাসে রাজ্যব্যাপী ব্যালটে কোনো মুসলিম প্রার্থী না থাকলেও ভোটাররা বলছেন, নির্বাচনের হিসাব তাঁদের কাছে অত্যন্ত স্থানীয়। হিউস্টনের আইনজীবী সামির নাদজাম (৪৫) ৩ নভেম্বরের ভোটের কয়েক দিন আগে পরিবার নিয়ে স্থানীয় একটি ইসলামিক সেন্টারের ‘ফল ফেস্ট’ উদযাপনে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি এটা সবচেয়ে বেশি অনুভব করি আমার সন্তানদের মাধ্যমে। প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আমরা বেছে নিতে পারি কার সঙ্গে মিশব। কিন্তু বাচ্চারা, তারা সবাই একসঙ্গে স্কুলে যায়, আর কিছু পরিবার নির্দিষ্ট সংবাদ দেখে। আর বাচ্চারা নানা কথা বলে, স্রেফ মন খারাপ করে দেওয়ার মতো কথা।’
টেক্সাসের জনসংখ্যার দুই শতাংশেরও কম মুসলিম। তবে সম্প্রদায়ের সংগঠকদের আশা, ভোটার উপস্থিতি বড় আকারে বাড়লে নির্বাচনী শক্তি দেখানো যেতে পারে। দল নির্বিশেষে অনেক মুসলিম ভোটার আল জাজিরাকে বলেছেন, তাঁরা বার্তা দিতে চান যে তাঁদের কারও রাজনৈতিক ‘ভয়ের পাত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
‘মুসলিমদের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়। সর্বত্র তাঁদের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়,’ বলেন ইসলামিক সোসাইটি অব গ্রেটার হিউস্টনের সভাপতি এমরান গাজি। এই সংগঠন হিউস্টন মহানগরে ৩০টির বেশি মসজিদ তদারকি করে। তিনি বলেন, সংগঠনটি এ বছর ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে এবং ধর্মীয় নেতারা জুমার নামাজের সময় ভোটের বার্তা দিচ্ছেন। গাজি বলেন, সোসাইটি নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেয় না, বরং সদস্যদের বিবেক অনুযায়ী ভোট দিতে উৎসাহ দেয়। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা নিশ্চিত করতে চাই যেন রাজনীতিক ও কর্মকর্তারা বোঝেন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁদের হিসাব করতে হবে।’
৪২ বছর বয়সী চিকিৎসক মারিয়াম আহমেদ বলেন, ‘সত্যি বলতে, এটা নরক যন্ত্রণার মতো। এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গত দুই বছরে আমি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার কথা ভেবেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার একটা সন্তান আছে। আমি চাই না তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে দেখা হোক। আমাকে ইতিমধ্যে এটা সহ্য করতে হয়েছে। আমি চাই না আমার সন্তানের সঙ্গে এমনটা হোক।’
রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ও রাজ্য রিপাবলিকান পার্টির বার্তা এখন ‘শরিয়া’ ধারণাকে কেন্দ্র করে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। ইসলামি রীতিনীতি ও চর্চার জন্য ব্যবহৃত এই ব্যাপক শব্দটিকে তাঁরা টেক্সাসের মানুষের জন্য আসন্ন হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। গত মাসে ডালাসে রিপাবলিকান মধ্যবর্তী সম্মেলনে অ্যাবট বলেন, ‘আমরা ওয়াশিংটন ডিসির জন্য অপেক্ষা করছি না। আমরা টেক্সাসে শরিয়া আইন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করব।’ একই অনুষ্ঠানে সিনেটর টেড ক্রুজ বলেন, ‘শরিয়া আইন মৌলিকভাবে সংবিধানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এবং এখনই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে তা থামাতে হবে।’
জুনে রাজ্য রিপাবলিকান পার্টি ‘ডোন্ট শরিয়া মাই টেক্সাস’ নামে একটি আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম গ্রহণ করে, যাতে এর প্রবক্তাদের জন্য ‘ফৌজদারি শাস্তি; সরকারি, সামরিক ও আইন প্রয়োগকারী চাকরি থেকে অযোগ্যতা; নাগরিকত্ব বাতিল; এবং বহিষ্কার’-এর অঙ্গীকার করা হয়। এর আগে মার্চে টেক্সাসের রাজ্য আইন প্রণেতারা ‘শরিয়া-ফ্রি টেক্সাস ককাস’ চালু করেন, যার সদস্য সংখ্যা ১৫০ আসনের কক্ষে এখন ৩৮। তার কয়েক মাস আগেই টেক্সাসের দুই মার্কিন প্রতিনিধি চিপ রয় ও কিথ সেলফ কংগ্রেসে ‘শরিয়া-ফ্রি আমেরিকা ককাস’ চালু করেন, যার সদস্য বেড়ে ৬৮ হয়েছে।
অধিকারকর্মী ও বাসিন্দারা বলছেন, ইসলামি আইনের ওপর এই জোর দেওয়া যতটা বিস্ময়কর ততটাই উদ্বেগজনক। টেক্সাসের বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো এলাকাতেই কোনো ধরনের ইসলামি আইন চালু হয়নি। সম্প্রতি হিউস্টনে আসা ৩৩ বছর বয়সী চিকিৎসক সারাহ দাব্বাস বলেন, ‘বাস্তব জীবনে কেউ এতটা ঘৃণা পোষণ করে না, যতটা তারা দেখাতে চাইছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কখনোই কেউ সরকারের ওপর মুসলিম আইন চাপিয়ে দেয়নি। আমরা তা পারিও না। এটা স্রেফ আমাদের চর্চার ধরন।’
পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, রাজ্যের কর্মকর্তারা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে উত্তর টেক্সাসে মুসলিমকেন্দ্রিক আবাসন প্রকল্প গড়তে চাওয়া একটি কোম্পানির তদন্ত এবং স্বেচ্ছামূলক ইসলামি সালিস তদারককারী গোষ্ঠীগুলো, যা খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মেও রয়েছে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইসলামবিদ্বেষ পর্যবেক্ষক সংস্থা দ্য ব্রিজ ইনিশিয়েটিভ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লিখেছে, রাজ্যের রাজনীতিকেরা ক্রমবর্ধমানভাবে ‘মুসলিম নাগরিক জীবনের সাধারণ প্রকাশ’-এর দিকে ইঙ্গিত করে যুক্তি দিচ্ছেন যে ইসলামি আইন এগিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘জনজীবনে অংশগ্রহণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সম্প্রদায়ের উন্নয়নে সম্পৃক্ততা’; ফলে কার্যত তাঁরা মুসলিমদের সক্রিয় নাগরিক হিসেবে অংশগ্রহণকে, এমনকি কখনো কখনো তাঁদের অস্তিত্বকেও, একটি বৃহত্তর হুমকির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
টেক্সাসের বিশিষ্ট রিপাবলিকান মুসলিমরাও এই রাজনৈতিক আবহ থেকে রেহাই পাননি। জুনে টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনে বিষয়টি চরমে ওঠে। টেক্সাস ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী রিপাবলিকান পার্টি চেয়ার আব্রাহাম জর্জ দুই মুসলিম প্রতিনিধিকে দল ছেড়ে যেতে বলেন। আরেক ঘটনায় এক রাজ্য সিনেটর একটি প্যানেলে বলেন, মুসলিমরা ‘শরিয়া অনুযায়ী মিথ্যা বলতে বাধ্য’ যাতে তারা নজরের আড়ালে থাকতে পারে। হয়রানির শিকারদের মধ্যে ছিলেন দলীয় প্রতিনিধি তারেক হুসেইনের ছেলে, যিনি ২০০০-এর দশকের শুরুতে কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর)-এর হিউস্টন কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
গভর্নর অ্যাবট, যিনি ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসার কাছ থেকে অনেকটা অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন, সিএআইআর টেক্সাসকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে মনোনীত করার চেষ্টা করেছেন, যে লেবেল সাধারণত ফেডারেল সরকার দিয়ে থাকে। অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন, যিনি ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকোর বিরুদ্ধে কড়া সিনেট লড়াইয়ে রয়েছেন, এরপর সিএআইআরের বিরুদ্ধে মামলা করে রাজ্যে এর কার্যক্রম বন্ধ করতে চেয়েছেন। অন্যদিকে সিএআইআর টেক্সাস বাক ও মতপ্রকাশের সাংবিধানিক স্বাধীনতার ভিত্তিতে অ্যাবটের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক মুসলিম রিপাবলিকান আল জাজিরাকে অভিজ্ঞতাটিকে ‘খুবই বেদনাদায়ক’ বলে বর্ণনা করেছেন। আরও হয়রানির আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক দিন ধরে রিপাবলিকানদের সঙ্গে জড়িত। আমি তাদের ব্যবসায়িক মূল্যবোধ ও পারিবারিক মূল্যবোধের সঙ্গে নিজেকে মেলাই।’ তিনি বলেন, তিনি এখনো স্থানীয় রিপাবলিকান রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও ব্যালটে কিছু রিপাবলিকান প্রার্থীকে বাদ দেবেন। তাঁর ভাষায়, অন্য রক্ষণশীল মুসলিমরা ‘হয়তো রিপাবলিকান পার্টির বাইরে ভোট দেবেন না, কিন্তু কিছু প্রার্থীর জন্য ভোট দেওয়া এড়িয়ে যেতে পারেন।’
স্থানীয় সংগঠকেরা বলছেন, সম্প্রদায়ের অসন্তোষকে রাজ্যব্যাপী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কোয়ালিশন ফর পিস, রিলিফ অ্যান্ড ইকুইটির সঙ্গে কাজ করা সানিয়া রহিম হিউস্টন ও পুরো রাজ্যে মুসলিমদের বিশাল বৈচিত্র্যের দিকে ইঙ্গিত করেন, যেখানে কোনো একটি জাতিগোষ্ঠীর আধিপত্য নেই। তিনি বলেন, ‘আপনি শুধু একটি আরবি রেডিও স্টেশনে গিয়ে মানুষকে ভোটের কথা বলতে পারবেন না, কারণ বড় একটি অংশ আরবি বলে না।’ তাঁর মতে, এলাকার মুসলিম ভোটাররা সাধারণত রাজ্যব্যাপী লড়াইয়ের চেয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে বেশি সক্রিয়।
তবে টেক্সাস শিক্ষা বোর্ডের সাম্প্রতিক একটি উচ্চবিদ্যালয় পাঠ্যক্রমের অনুমোদন বিশেষভাবে উদ্দীপনা জাগিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই পাঠ্যক্রমে ‘কট্টর ইসলাম’ ধারণার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
হিউস্টনের ইসলামিক সেন্টারের ‘ফল ফেস্টে’ সিএআইআর অ্যাকশনের টেবিলে দায়িত্ব পালনকালে সংগঠনটির নাগরিক সম্পৃক্ততা সংগঠক সামিহা রিজভি বলেন, ‘আমাদের অনেক নেতা মনে করেন, যা ঘটছে তা থেকে বের হওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো মাথা নিচু করে চুপ থাকা।’ তিনি বলেন, ‘তারা হয়তো মানুষকে ভোট দিতে বলছেন, কিন্তু অনেক বিষয়ে জনমতের আদালতে তারা মুখ খুলছেন না।’ এরপর বাউন্স হাউস, পেটিং চিড়িয়াখানা ও খাবারের দোকানের কোলাহলের মধ্যেই মাইক্রোফোন হাতে তিনি ভোটের আহ্বান জানান: ‘আমরা যেভাবে পরিস্থিতি বদলাতে পারি, যেভাবে এই রাজ্যকে আমাদের পরিবারের জন্য নিরাপদ করতে পারি, তা হলো এই নির্বাচনে ভোট দেওয়া। এখানে একটি স্পষ্ট পছন্দ রয়েছে।’

