খুলনায় ১২ দিনে সাত খুন, রূপসার নদীর চরে মিলল দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ
খুলনায় সহিংসতার ধারাবাহিকতা কোনোভাবেই থামছে না। সর্বশেষ রূপসা উপজেলার আঠারোবেকি নদীর চরে দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে গত ১২ দিনে খুলনা মহানগর ও জেলায় প্রাণ গেছে সাতজনের। একই সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও পাঁচজন, যাদের মধ্যে যুবদলের বর্তমান ও সাবেক তিন নেতা রয়েছেন।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের সিংহের চর এলাকা থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত ব্যক্তিরা হলেন মেহেদী হাসান (৩৫) ও রেজাউল করিম (৩০)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার দুপুরে আঠারোবেকি নদীর চরে প্রথমে একটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। পরে ভাটার সময় পানি কমে গেলে একই স্থানে আরেকটি মরদেহ দেখতে পান তারা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় মরদেহ দুটি উদ্ধার করে।
নিহত মেহেদী রূপসার রাজাপুর এলাকার আব্দুল্লাহর ছেলে। একসময় তিনি জেলখানা ঘাটের মাঝি ছিলেন। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, খুলনার অপরাধজগতে আলোচিত রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর গড়া সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘বি-কোম্পানি’র সক্রিয় সদস্য ছিলেন মেহেদী ও রেজাউল। দুজনের শরীরেই গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।
রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান বলেন, মেহেদী ও রেজাউলকে গুলি করে হত্যার পর তাদের মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মেহেদীর চোখের ওপর ভ্রুর পাশে গুলির চিহ্ন রয়েছে; রেজাউলের থুতনির নিচে ও পিঠে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। হত্যার কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
মেহেদীর মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন তার বাবা আব্দুল্লাহ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মেহেদী আলাদা থাকতেন; ছেলের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না।
এর আগে গত রোববার সন্ধ্যায় নগরের আড়ংঘাটা থানার রায়েরমহল এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে খুন হন খুলনা মহানগর তাঁতি দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির। দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। শনিবার রাতে নগরের লবণচরা এলাকার একটি সড়ক থেকে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ; তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার পর সড়কে ফেলে রাখা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
২৫ অক্টোবর নগরের সোনাডাঙ্গা থানা এলাকায় একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২৪ অক্টোবর দক্ষিণ টুটপাড়া গাছতলা এলাকায় কলেজশিক্ষক ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডুকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। একই দিন সকালে তেরখাদা উপজেলায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাস।
২২ অক্টোবর সকালে নগরের পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন সন্ধ্যার পর জিন্নাহপাড়া এলাকায় গুলিতে প্রাণ হারান এক গৃহবধূ।
হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি গুলির ঘটনাও বেড়েছে। ২৬ অক্টোবর রাত থেকে ২৭ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত তিনটি পৃথক গুলির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বটিয়াঘাটা উপজেলার দুটি স্থানে গুলিতে আহত হন যুবদলের সাবেক দুই নেতা; খুলনা নগরে গুলিবিদ্ধ হন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। এছাড়া ২৪ অক্টোবর তেরখাদায় গুলিবিদ্ধ হন যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাস।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ নভেম্বর পর্যন্ত খুলনা মহানগর ও জেলায় গুলি, ধারালো অস্ত্রের আঘাতসহ বিভিন্নভাবে ৭৫ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, পূর্বশত্রুতা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিরোধের মতো কারণ রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও গুলির ঘটনায় নগর ও জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, হত্যার কারণ উদ্ঘাটন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।




