খুলনায় চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ চিকিৎসক-ব্যবসায়ীরা, ১০ মাসে ৭৫ খুন

খুলনা নগরীর কমার্স কলেজের পাশে এক চিকিৎসকের কাছে ৩ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিল এই অঞ্চলের শীর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠন ‘বি কোম্পানি’। ভয়ে থানায় কোনো অভিযোগ না দিয়ে চেম্বার বন্ধ রেখে আত্মগোপনে আছেন তিনি।
ওই এলাকার আরও এক চিকিৎসকের কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল; ভয়ে তিনি ভারতে চলে গেছেন। বড় অঙ্কের চাঁদা চাওয়ায় আরও এক চিকিৎসক আত্মগোপনে আছেন।
সন্ধানী ক্লিনিকের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে ভাঙচুর ও গুলির ঘটনার পর ১ কোটি টাকায় ‘বি কোম্পানি’র সঙ্গে সমঝোতা করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়নি। পরে খুলনা সদর থানা-পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে।
এ ছাড়া এক সাব-রেজিস্ট্রারকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মাসে মাসে চাঁদা দেওয়ার শর্তে তিনি ছাড়া পেয়েছেন বলে জানা যায়।
খুলনায় এ রকম অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান চাঁদাবাজির শিকার। চাঁদাবাজদের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছেন না সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ১০ মাসে চাঁদাবাজি, মাদক, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা ঘটনায় নগরীতে ৩৭টি এবং জেলায় ৩৮টি খুনের ঘটনা ঘটে।
সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা পাননি পুলিশ কর্মকর্তাও। গত ৯ অক্টোবর পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলমকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা।
গত ২৮ অক্টোবর ২০ লাখ টাকা ও ১০টি মোটরসাইকেল চাঁদা চেয়ে নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের ‘চয়নিকা’ ফার্মেসির ম্যানেজার বাবুকে হুমকি দেয় খুলনার শীর্ষ একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। এ ঘটনার পর ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে গা ঢাকা দিয়েছেন। দোকানটি বর্তমানে বন্ধ। একই দিনে সন্ধ্যায় নগরীর আহসান আহমেদ রোডের চায়নিজ প্যালেসে ভাঙচুর চালায় সন্ত্রাসীরা।
এ ছাড়া ২৪ অক্টোবর ১০ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে নগরীর বাবু খান রোডে সন্ধানী ক্লিনিকে ভাঙচুর ও গুলি চালানো হয়। পরদিন সোনাডাঙ্গায় সন্ধানী ক্লিনিকের দ্বিতীয় শাখায় সশস্ত্র মহড়া দেয় দুর্বৃত্তরা।
গত ২৬ অক্টোবর খুলনার পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আহসানারা বিনতে আহমেদের কাছে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। ‘হয় অর্থ, নয় রক্ত’ এমন হুমকিও দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ওই কর্মকর্তা স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর পুলিশ দুজনকে আটক করে।
গত ২৫ অক্টোবর মোটা অঙ্কের চাঁদা চেয়ে পাইকগাছা থানা আইনজীবী সমিতির সভাপতি জি এম আব্দুস সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক জি এম আক্কাস আলীকে আলাদাভাবে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়। তাঁরা দুজন থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
গত ২৪ অক্টোবর দুর্বৃত্তের গুলিতে ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডু (৪৫) নামের এক প্রভাষক আহত হন। ২৭ অক্টোবর নিরালায় সিগারেট কোম্পানির পিয়ন সালমানকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ২৬ অক্টোবর জেলার বটিয়াঘাটায় যুবদল কর্মী সোহেল এবং ২৭ অক্টোবর যুবদল সভাপতি অহিদুল ইসলাম বাদলকে গুলি করা হয়। বর্তমানে তাঁরা ঢাকায় চিকিৎসাধীন।
খুলনায় ২২টি সন্ত্রাসী সংগঠন, ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিটি গ্রুপই পুলিশের তালিকাভুক্ত। সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে বাবু ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন বি কোম্পানি, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, গোল্ডেন বয়েজ, টিপসি বয়েজ, কিং অব রূপসা ও পলাশ গ্রুপ।
পুলিশের অভিযোগ, ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করতে চাইছে না। খুলনা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা বলছেন, সন্ত্রাসীরা জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধে যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেছে।




