পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে তিন দিনের অস্থিরতা, প্রায় ৬৯০ কারখানা বন্ধ; গাজীপুরে গুলির খবর গুজব বলল পুলিশ

বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে তিন দিন ধরে অস্থিরতা চলছে এবং প্রায় ৬৯০টি কারখানা বন্ধের খবর এসেছে। এই অস্থিরতার পেছনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ইন্ধন দেখছে সরকার—এ ধরনের খবর সোমবার (২ নভেম্বর) প্রায় সব পত্রিকার প্রথম পাতায় জায়গা পেয়েছে।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গত রোববার থেকে শুরু হওয়া পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরে সহিংস রূপ নেয়। চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়া শ্রমিকেরা মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।
একটি পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, ডিসেম্বর ঘিরে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীদের নভেম্বর মাসজুড়ে সংঘাত-সহিংসতার পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে দেওয়ার পরও তেমন প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে সীমান্তের ওপারে কলকাতায় বসে নাশকতার ছক তৈরি করার বিষয়েও সরকারের কাছে স্পষ্ট তথ্য ছিল বলে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।
খবরে আরও বলা হয়, সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করতে আন্দোলনে ঢুকে পড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীরা, আর এর নেপথ্যে শক্তি ও অর্থের জোগানদাতা শিল্পমালিকরাই। গাজীপুর অঞ্চলে শিল্প কারখানার ২৬৭ জন মালিক আওয়ামীপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো কোনো ভূমিকা না থাকায় এখন খেসারত দিতে হচ্ছে বলে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ প্রভাবশালী নেতারা বিদেশে বসে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। অনেকেই কলকাতায় বসে ছক আঁটছেন, আর পশ্চিমা দেশগুলোতে বসে দলটির প্রভাবশালী নেতারা নাশকতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে উসকানি দিচ্ছেন বলেও খবরে বলা হয়েছে।
এদিকে গাজীপুরে চলমান আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে কোনো শ্রমিক আহত বা নিহত হয়নি বলে দাবি করেছে জেলা পুলিশ। এ ধরনের খবরকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া গুজব উল্লেখ করে আন্দোলনকারী শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে অপপ্রচারে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাহিনীটি। সোমবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক, সফিপুর, পল্লীবিদ্যুৎ ও চন্দ্রাসহ বিভিন্ন এলাকায় বেতন বৃদ্ধিসহ নানা দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকেরা আন্দোলন করেন। চলমান আন্দোলনে সাধারণ শ্রমিকদের আড়ালে কোনো দুষ্কৃতকারী বা অশুভ চক্র যাতে সহিংসতা, ভাঙচুর কিংবা রাষ্ট্রীয় ও জনগণের সম্পদের ক্ষতি করতে না পারে, সে লক্ষ্যে পুলিশ সংযম, ধৈর্য ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে এবং পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ আন্দোলনকারীদের উসকে দিতে পুলিশের গুলিতে শ্রমিক বা শিক্ষার্থী আহত-নিহত হওয়ার গুজব ছড়াচ্ছে। বাস্তবে গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে পুলিশের পক্ষ থেকে গুলি চালানো কিংবা গুলিতে কোনো আন্দোলনকারী আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদারের স্বাক্ষরিত পৃথক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোমবার মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের একটি অংশ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধের চেষ্টা করে। এ সময় একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা, ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। একপর্যায়ে নাওজোড় এলাকায় দুর্বৃত্তরা পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর করে এবং একটি পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে জেলা পুলিশের একজন সদস্য সামান্য আহত হন। জিএমপির শ্রীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ এলাকায় হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বহিরাগত ও অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া ঠেকাতে বাড়ির মালিকদের সতর্ক করেছে কালিয়াকৈর উপজেলা প্রশাসন। সোমবার কালিয়াকৈর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাড়ি বা ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়ারা পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কোনো বহিরাগত ব্যক্তিকে আশ্রয় দিলে কিংবা কোনো অপরাধ চক্রের সদস্য বাসা ভাড়া নিয়ে অবস্থান করলে দ্রুত কালিয়াকৈর থানা অথবা উপজেলা প্রশাসনকে জানাতে হবে। এ বিষয়ে তথ্য গোপন করা হলে কিংবা বহিরাগতদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিকদের দায়ভার বহন করতে হবে বলেও গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
পুলিশ জানায়, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে গত রোববার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। তাই দুষ্কৃতকারীদের প্ররোচনা ও উসকানিতে সহিংসতা, জ্বালাও-পোড়াও ও ভাঙচুরে জড়িয়ে না পড়ে শ্রমিকদের নিজ নিজ কাজে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ; একই সঙ্গে আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশ পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।
তৈরি পোশাক খাত নিয়ে আরেকটি পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, একের পর এক সংকট সামলেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ছে এবং সরকারের সহায়তা পাওয়ার দিক থেকেও তৈরি পোশাকশিল্প অন্যান্য খাতের চেয়ে এগিয়ে আছে। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরিতে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের শীর্ষ ক্রেতা সুইডেনভিত্তিক এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের গত মার্চের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চীন, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, ভারত ও তুরস্ক—এই সাত দেশের সবকটিতেই পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। দেশের ট্যানারি, জাহাজভাঙা, স মিল এবং নির্মাণ—এই চার খাতেও ন্যূনতম মজুরি পোশাকশিল্পের চেয়ে বেশি।
শ্রমিকনেতারা বলছেন, আগে বোর্ড গঠন করে মজুরি নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নিলে এই অস্থিরতা এড়ানো যেত। অন্যদিকে মালিকপক্ষ বলছে, শ্রমিকের কম উৎপাদনশীলতা, কম দামের পোশাক এবং পোশাক তৈরিতে কম মুনাফা হওয়ায় শ্রমিকদের বেতন তুলনামূলক কম। গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গত কয়েক দিন ধরে চলা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।



