পোল্যান্ডে সর্বোচ্চ আদালতের দখল নিয়ে সংঘাত: প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী মুখোমুখি
পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত তীব্র আকার নিয়েছে। মধ্য ওয়ারশর ক্রিম রঙের যে প্রাসাদে এই আদালত অবস্থিত, তার সামনে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের ভিড়ের মধ্যেই চলছে এই লড়াই।
উদারপন্থী ও ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক আগের জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী ল অ্যান্ড জাস্টিস (পিআইএস) সরকারের আমলে ট্রাইব্যুনালে করা পরিবর্তনগুলো উল্টে দিতে চান। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি পিআইএসপন্থী বিচারকদের দায়িত্বে রাখতে লড়ছেন, এমনকি শারীরিকভাবেও।
সরকারের দাবি, আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম মেনে চলতে আদালতের সংস্কার জরুরি। নাওরোকির সমর্থকদের অভিযোগ উল্টো—তারা বলছেন, টাস্ক একটি অভ্যুত্থানকে সমর্থন দিচ্ছেন।
মঙ্গলবার এই সংঘাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা। টাস্কের ক্ষমতাসীন সংসদীয় জোটের সমর্থিত আটজন বিচারক সেদিন বৈঠক করে ট্রাইব্যুনালের বাজেট অনুমোদন এবং এর সভাপতি বোগদান শ্ভিয়েঞ্চকোভস্কি ও তার ডেপুটি বার্তলোমিয়েই সোচানস্কির বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাগত ব্যবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করার পরিকল্পনা করেছেন।
তবে বৈঠক বৈধ হতে হলে আদালতের ১৫ বিচারকের মধ্যে অন্তত ১০ জনকে উপস্থিত থাকতে হবে। অর্থাৎ এই আট বিচারককে আগের পিআইএস সরকারের আমলে বেছে নেওয়া অন্তত দুজন বিচারককে নিজেদের পক্ষে টানতে হবে।
আদালতের বাইরে টাস্ক সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেন পিআইএসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইয়ারোস্লাভ কাচিনস্কি, চরম ডানপন্থী পোলেক্সিট প্রচারক গ্জেগোর্য ব্রাউন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাতেউশ মোরাভিয়েৎস্কি এবং লিবারটারিয়ান নেতা স্লাভোমির মেনৎজেন। মেনৎজেনের কনফেডারেশন দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট আন্না ব্রিলকা বলেন, তাদের কর্মসূচিতে অনেক মতপার্থক্য থাকলেও প্রধানমন্ত্রী টাস্কের সরকারের অবসান ঘটানোই তাদের মৌলিক অভিন্ন লক্ষ্য।
আগামী বছরের সংসদ নির্বাচনের আগে এই সংকট ডানপন্থী বিরোধী দলগুলোকে একজোট হতে সাহায্য করছে। জনমত জরিপের হিসাবে টাস্কের সিভিক কোয়ালিশন এগিয়ে থাকলেও তার ছোট শরিক দলগুলো পরের সংসদে নাও ঢুকতে পারে—তখন পিআইএস ও অন্য ডানপন্থী দলগুলোর জন্য পথ খুলে যেতে পারে, যদি তাদের নেতারা একসঙ্গে কাজ করতে পারেন।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ও সাবেক বিচারমন্ত্রী বরিস বুদকা বলেন, এই নির্বাচন পোলিশ গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। তার ভাষায়, ডানপন্থী জোট ক্ষমতায় এলে তারা জবাবদিহি করতে পারে এমন স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মূল করবে এবং পোল্যান্ডকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে নেবে—যা নিয়ে তারা প্রকাশ্যেই আলোচনা করেছে। কাচিনস্কি গত সপ্তাহে পোলেক্সিটের সম্ভাবনাও তোলেন।
এই বিবাদের শিকড় ২০১৫ সালের অক্টোবরে। সিভিক প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তখন সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের পাঁচজন বিচারক নির্বাচন করে—তিনজন বিদ্যমান শূন্যপদে এবং দুজন ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর খালি হওয়ার কথা থাকা আসনে। পিআইএস নির্বাচনে জেতার পর সব পাঁচটি নির্বাচনই বাতিল ঘোষণা করে, নিজেদের পাঁচজন প্রতিস্থাপন বিচারক নির্বাচন করে এবং প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেই দুদা তাদের শপথ পড়ান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ আদালত রায় দেয়, এক দশক আগের নিয়োগের অনিয়মের কারণে ট্রাইব্যুনালটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতের মান পূরণ করে না।
২০২৩ সালে ক্ষমতায় ফিরে টাস্ক আইনের শাসন ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও দুদা ও পরে ২০২৫ সালে পিআইএসের সমর্থনে প্রেসিডেন্ট হওয়া নাওরোকি তার প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেন। বর্তমান সংকটের সূত্রপাত নাওরোকির সেই সিদ্ধান্ত থেকে, যেখানে তিনি সংসদে নিয়োগ পাওয়া আট বিচারকের মধ্যে বেছে বেছে কাউকে শপথ পড়িয়েছেন—সমালোচকদের মতে যা সংবিধানের সরাসরি লঙ্ঘন।
ট্রাইব্যুনালের সভাপতি শ্ভিয়েঞ্চকোভস্কি নতুন বিচারকদের আদালত ভবনে ঢুকতেই দেননি। শুক্রবার সবচেয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা বিচারক আন্না কোরউইন-পিওত্রোভস্কা শ্ভিয়েঞ্চকোভস্কি ও তার ডেপুটি সোচানস্কিকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় নাওরোকি সেনেগালের সরকারি সফর মাঝপথে ছেড়ে স্পেনের আকাশ থেকে বিমান ঘুরিয়ে ওয়ারশ ফেরেন এবং শনিবার রাত ১টায় ট্রাইব্যুনালে পৌঁছান। ধারণ করা ভিডিওতে তাকে কোরউইন-পিওত্রোভস্কাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকতে দেখা গেছে; প্রেসিডেন্টের শিবিরের দাবি, অবৈধ শারীরিক সংস্পর্শ বিচারকরাই করেছিলেন।
শ্ভিয়েঞ্চকোভস্কি প্রতিদিন ট্রাইব্যুনালের ফটকে এসে ঢুকতে দেওয়ার দাবি জানানোর প্রতিজ্ঞা করেছেন এবং নিজেকেই এখনো সভাপতি বলে দাবি করছেন। সোমবার টাস্ক লিখেছেন, সংবিধান বদলানো ছাড়াই এই সংঘাতের সমাধান সহজ ও সম্ভব—নাওরোকির উচিত সংসদে আইনসম্মতভাবে নির্বাচিত বিচারকদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের দায়িত্ব নিতে দেওয়া। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নাওরোকি এমন সংঘাত বেছে নিয়েছেন যার মূল্য পোল্যান্ডকে চড়া দিতে হতে পারে, এবং বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সহিংসতার কাছে নতি স্বীকার করবে না।



