শান্তি হলে ইউক্রেনে মোতায়েনের মহড়া: পোল্যান্ডে ১২ দেশের প্রায় ৩ হাজার সেনার অনুশীলন

শান্তিচুক্তি হলে ইউক্রেনে মোতায়েনের প্রস্তুতি পরীক্ষা করতে একটি বহুজাতিক বাহিনীর মহড়ার নেতৃত্ব দেবে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। এই মাসে প্রতিবেশী পোল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় এই মহড়ায় ১২টি ইউরোপীয় দেশের প্রায় ৩ হাজার সামরিক সদস্য অংশ নেবেন।
ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রস্তাবিত দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তার একটি হিসেবে ইউক্রেনের জন্য একটি আশ্বাস বাহিনীর (রিঅ্যাসুরেন্স ফোর্স) পরিকল্পনা গত বছরই তুলে ধরা হয়েছিল।
তবে বাস্তবে এমন একটি সামরিক বাহিনী কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে এখনো উত্তর পাওয়ার চেয়ে প্রশ্নই বেশি। পশ্চিমা কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, ইউক্রেনে পাঠানো কোনো বাহিনী কোনো আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেবে না, শান্তিরক্ষা বা যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের মিশনেও থাকবে না।
তাঁরা ন্যাটোর কমান্ডের অধীনেও কাজ করবেন না, সম্মুখসারিতেও থাকবেন না। কর্মকর্তাদের ভাষায়, তাঁদের উপস্থিতির উদ্দেশ্য হবে ইউক্রেনকে আশ্বস্ত করা এবং তার সশস্ত্র বাহিনী পুনর্গঠনে সাহায্য করা।
যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় যুক্ত থাকলেও এই মিশনে কোনো সেনা দিচ্ছে না।
রাশিয়া ইতিমধ্যে ইউক্রেনে বিদেশি সেনা মোতায়েনের বিরোধিতা জানিয়েছে। গত বছর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন, তারা হবে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’। ইউক্রেনে আন্তর্জাতিক সেনারা আক্রান্ত হলে যুদ্ধে জড়ানোর নিয়ম (রুলস অব এনগেজমেন্ট) কী হবে, তা স্পষ্ট করতে রাজি হননি পশ্চিমা কর্মকর্তারা; তবে তাঁরা বলেছেন, বাহিনীটি নিজেকে রক্ষা করতে পারবে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, এই মহড়া দেখাচ্ছে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও তাদের মিত্ররা ইউক্রেনে শান্তি আসার দিনের জন্য প্রস্তুতি জোরদার করছে। তিনি বলেন, ‘এটি কোনো কাল্পনিক পরিকল্পনা নয়, এটি একটি বাস্তব বাহিনী, লড়াই থামলেই ইউক্রেনকে সাহায্য করতে প্রস্তুত।’
মাল্টি ন্যাশনাল ফোর্স–ইউক্রেনের (এমএনএফ-ইউ) যুক্তরাজ্য কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল টম বেটম্যান বলেছেন, এই মহড়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাসযোগ্য সামরিক প্রস্তুতিতে রূপ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাঁর ভাষায়, এটি একটি ‘বাস্তব, সক্ষম, সহজে মোতায়েনযোগ্য বাহিনী, যা ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি ও নিরাপত্তার প্রতি ইচ্ছুক দেশগুলোর জোটের (কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং) গুরুতর প্রতিশ্রুতির প্রতিনিধিত্ব করে’।
৯ থেকে ২২ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় ‘এক্সারসাইজ কোয়ালিচজা’ হবে ইউক্রেনে একটি বাহিনীকে কীভাবে সরানো, সুরক্ষা দেওয়া ও সরবরাহ পৌঁছানো যায় তার মহড়া। বিভিন্ন দেশের সেনারা একসঙ্গে কাজ করতে পারেন কি না, তা নিশ্চিত করতে এটি তাদের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থারও পরীক্ষা হবে।
স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথ মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৮০০ সামরিক সদস্য এতে অংশ নেবেন। যুক্তরাজ্যের অবদানের মধ্যে থাকছে ৩০০ সেনা ও এক জোড়া আরএএফ টাইফুন যুদ্ধবিমান। ইউক্রেনের আকাশ আবার খুলে দেওয়া গেলে বাণিজ্যিক বিমানকে কীভাবে আশ্বস্ত করা যায়, যুদ্ধবিমানগুলো তার অনুশীলন করবে।
তুরস্ক সমুদ্র মিশনের নেতৃত্ব দিতে রাজি হয়েছে। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে মাইন পরিষ্কার করা এবং কৃষ্ণ সাগরে বাণিজ্য আবার শুরু করার সুযোগ তৈরি করা। যুক্তরাজ্য ছাড়া সেনা আসবে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, এস্তোনিয়া, জার্মানি, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন ও তুরস্ক থেকে।
তবে লড়াই থামলে ইউক্রেনে মোতায়েন হতে পারে এমন বাহিনীর চূড়ান্ত গঠন ও আকার সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারেননি পশ্চিমা কর্মকর্তারা। অতীতে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পশ্চিমা দেশগুলোকে হয়তো কয়েক হাজার নয়, কয়েক দশ হাজার সেনা পাঠাতে হতে পারে। কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি ও অবদান নির্ভর করবে যুদ্ধ বন্ধের পরিস্থিতি এবং প্রতিটি দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
যুদ্ধে অভিজ্ঞ ইউক্রেনকে পশ্চিমা বাহিনী কী ধরনের প্রশিক্ষণ দিতে পারবে, তাও স্পষ্ট নয়। ড্রোন যুদ্ধে দক্ষতা ভাগ করে নেওয়ায় ইউক্রেনীয় সেনারাই এখন ন্যাটো বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক চাহিদার মুখে আছেন। সব কিছুর ঊর্ধ্বে, রাশিয়া তার যুদ্ধ শেষ করতে চাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখায়নি।




