প্রথম আলো ভবনে হামলার সাড়ে ১০ মাসেও তদন্ত শেষ হয়নি, গ্রেপ্তার ৩৯ জনই জামিনে মুক্ত
প্রথম আলো ভবনে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের সাড়ে দশ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। হামলার পরিকল্পনাকারী ও সমন্বয়কারীদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি, অভিযোগপত্রও জমা পড়েনি।
অথচ গত ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুই মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশের পর আট মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ হয়নি।
এই মামলায় বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ৩৯ জন। তাঁদের সবাই এখন জামিনে মুক্ত। মামলার তদন্ত তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তা বলছেন, নতুন আসামি শনাক্ত করার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর প্রথম আট দিনে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আরও ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে একজনকে গ্রেপ্তার দেখানোর পর আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
মামলার তদন্তের দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিবির কর্মকর্তারা হামলাকারীদের পাশাপাশি উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় দশ মাস ধরে হামলার সময়ের ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া লাইভ ভিডিও পর্যালোচনা করেও সংশ্লিষ্ট সবাইকে শনাক্ত করতে পারেনি ডিবি। হামলার ছক কারা করেছিল, কত দিন ধরে প্রস্তুতি চলেছিল, এতে অর্থ বা রাজনৈতিক সহায়তা ছিল কি না—এসব প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি।
মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তা, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, 'ডার্ক ওয়েবের একটি গ্রুপকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম, তারাও নতুন করে কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। তাই এখন আসামি শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।' এখন কী করবেন—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আপনারা বললে আমরা চার্জশিটের (অভিযোগপত্র) দিকে যেতে চাই।'
তবে মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, হামলায় জড়িত আরও দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। যদিও তাঁদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
ডিবির কর্মকর্তারা জানান, হামলার সময় ঘটনাস্থলে থাকা আরও অনেকের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁদের কেউ কেউ সরাসরি ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে অংশ নিয়েছিলেন। কেউ কেউ হামলাকারীদের সঙ্গে অবস্থান, স্লোগান ও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছেন এবং অগ্নিসংযোগের সময় আশপাশে সক্রিয় ছিলেন। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ, সংবাদমাধ্যমের ধারণ করা ছবি ও বিভিন্ন স্থিরচিত্র সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করেও সবাইকে শনাক্ত করা যায়নি।
তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, 'আমরা যখন ধরাধরি শুরু করি, তখন তাঁরা ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট ডিলিট করে ফেলেন। প্রথম দফায় যেভাবে ধরপাকড় করেছিলাম, পরে সেভাবে আর পারিনি। মোবাইল ফোনে উসকানি দিয়েছে এমন কিছু লোক নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু মোবাইল লোকেশনে ঘটনাস্থলে উপস্থিতি কিংবা লিংক পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তাঁদের মামলায় রাখা যায়নি।'
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ মিনহাজ উদ্দিন বলেন, তিনি মামলার তৃতীয় তদন্ত কর্মকর্তা। আগের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ত্রিদীপ বড়ুয়ার কাছ থেকে তিনি নথিপত্র বুঝে নিয়েছেন। হামলার রাতের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। তিনি বলেন, আগের তদন্ত কর্মকর্তা ছয়জন ছাড়া অন্য কোনো আসামির মুঠোফোন জব্দ করেননি। তাই কেবল ওই ছয়জনের মুঠোফোন ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি।
মিনহাজ উদ্দিন বলেন, প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলায় জড়িত আরও দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা ঢাকার একটি মাদ্রাসার। তবে তাঁদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর পুড়িয়ে দেওয়া ভবনে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনী ঘুরে দেখার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, 'আগামী দুই মাসের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত কার্যক্রম সমাপ্ত করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিলের জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। তারপর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।' সেদিন তিনি আরও বলেছিলেন, বিচারিক কার্যক্রমে সবার সহযোগিতা চাওয়া হবে, যাতে দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয় এবং এই জাতীয় ঘটনা ভবিষ্যতে আর না ঘটে।
ওই নির্দেশের পর চার মাস আগে ডিবিপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম মামলার অগ্রগতি জানাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন বলে জানিয়েছেন।
মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান বলেন, ভয়াবহ এই হামলার ভিডিও ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা ও স্থিরচিত্রসহ অনেক তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণ রয়েছে। সরকারের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে যাঁরা উসকানি দিয়েছেন ও হামলায় অংশ নিয়েছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হামলার পর তেজগাঁও থানার পুলিশ প্রথম আট দিনে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর মামলার তদন্তের দায়িত্ব ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়। ডিবি পরবর্তী প্রায় দশ মাসে আরও ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫ জনকে প্রথমে ডেইলি স্টার ভবনে হামলার মামলায় এবং একজনকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল; পরে প্রথম আলোর মামলায়ও তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে একটি গোষ্ঠী ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনে হামলা চালায়। হামলাকারীরা ভবনের ফটকের শাটার ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। একই রাতে সমন্বিত হামলা হয় দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয় ও ছায়ানট ভবনে। পরদিন সন্ধ্যায় উদীচী কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। প্রথম আলো ভবনে হামলার ঘটনায় ২১ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে তেজগাঁও থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, সাইবার সুরক্ষা আইনসহ দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়।



