দুই মাসে সিলিন্ডারে বাড়তি ৪৭৫ টাকা: এলপিজির নতুন দামে মধ্যবিত্তের সংসার হিসাব এলোমেলো

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব কর্মকর্তা তানজিমুল ইসলাম মঙ্গলবার সকালে কারওয়ান বাজারে এসে রান্নার গ্যাসের নতুন দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। তাঁর ভাষায়, এক মাসের ব্যবধানে রান্নার গ্যাসের দাম আবার ২২৩ টাকা বেড়েছে, আগের মাসেও বেড়েছিল ২৫২ টাকা — দুই মাসে প্রায় ৫০০ টাকা বাড়তি খরচ তিনি কীভাবে সামলাবেন, বেতন তো বাড়েনি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সোমবার (২ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নভেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে। নতুন দাম ওই দিন রাত ৮টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
এর আগে অক্টোবরে একই সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে সেপ্টেম্বরের ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে মাত্র দুই মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা। বৃদ্ধির হার প্রায় ৩০ শতাংশ।
কিন্তু নির্ধারিত দামে দোকানে গ্যাস মিলছে না বলেও অভিযোগ করেছেন ভোক্তারা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা গৃহিণী ইসরাফ জাহান সাইফা বলেন, সোমবার রাতে টেলিভিশনে তিনি দেখেছেন ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা করা হয়েছে। কিন্তু সকালে সিলিন্ডার নিতে গেলে দোকানি ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা চেয়েছেন। গত দেড় মাস ধরেই গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে সমস্যা চলছে বলেও জানান তিনি।
রায়েরবাজার এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. ইয়াসিন আলী বলেন, সংসারে রান্নার জন্য গ্যাস কিনতেই হবে, চাইলেই এই খরচ বাদ দেওয়া যায় না। আগে একটি সিলিন্ডার কিনতে যে টাকা লাগত, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি দিতে হচ্ছে। ফলে বাজারের অন্য খরচ কমিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে তাঁদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে।
নিউমার্কেটে বাসার জন্য সিলিন্ডার নিতে আসা বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক জহিরুল ইসলাম বলেন, চাল-ডাল, সবজি ও মাছ-মাংসের দাম, বাসাভাড়া ও বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি এখন গ্যাসের দামও বাড়ছে। অথচ বেতন প্রতি মাসে এভাবে বাড়ছে না। এসব খরচ মেটাতে গিয়ে সঞ্চয় তো দূরের কথা, অনেক সময় ধার করে চলতে হচ্ছে।
অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তাঁরা ইচ্ছা করে বেশি দাম নিচ্ছেন না। নিউমার্কেটের খুচরা বিক্রেতা মোসলেহ উদ্দিন বেপারি বলেন, সরকার ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করলেও ডিলারদের কাছ থেকে সিলিন্ডারটি তাঁদের কিনতেই ২ হাজার ২৫০ টাকা লাগছে। তাহলে পরিবহন ও দোকানের খরচ বাদ দিয়ে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা কীভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট শুধু দাম বাড়ার নয়। সরকার নির্ধারিত দাম ও বাস্তবে ভোক্তার দেওয়া অর্থের মধ্যেও বড় ব্যবধান রয়েছে। ২ হাজার ৬০ টাকার সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হলে ক্রেতাকে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩৪০ টাকা বেশি দিতে হয়। যথাযথ তদন্ত ও বাজার তদারকি ছাড়া নতুন মূল্য নির্ধারণের সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছানো কঠিন বলেও মত তাঁদের।
এলপিজির বাজারে অস্থিরতার পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধিই নয়, আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। ফলে কয়েকটি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ কমে গেলে পুরো বাজারে তার প্রভাব পড়ে।
আমদানিকারকদের তারল্যসংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোরও তারল্যসংকট রয়েছে। প্রয়োজনে তাদের নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
আমদানি পরিস্থিতির তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বসুন্ধরা এলপিজি ৬৬ হাজার ৮৬৪ মেট্রিক টন গ্যাস আমদানি করলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১০ হাজার ২৭ মেট্রিক টনে নেমেছে। একই সময়ে জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাসের আমদানি ৮২ হাজার ৬৪৫ মেট্রিক টন থেকে কমে ৮ হাজার ৮০০ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। দেশে আমদানির সক্ষমতা থাকা ২৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়মিত আমদানি করছে মাত্র ৮ থেকে ৯টি প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক মতবিনিময় সভায় দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই বলে দাবি করেন আমদানিকারক ও অপারেটররা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যের বরাত দিয়ে সভায় জানানো হয়, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন এবং সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সভায় উপস্থাপিত তথ্যে জোগান ও মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক বলা হয়। তবে কেউ অবৈধভাবে মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
একই এলাকার আরেক খুচরা বিক্রেতা মো. আলাউদ্দিন বলেন, আগে যেভাবে নিয়মিত সিলিন্ডার পাওয়া যেত, এখন সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলারের কাছে অর্ডার দিয়েও অনেক সময় চাহিদামতো গ্যাস পাওয়া যায় না। আবার সরবরাহ পেলেও আগের তুলনায় বেশি টাকা দিতে হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বিইআরসির ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। গণশুনানির মাধ্যমে দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভোক্তাদের স্বার্থ ও বাজার পরিস্থিতিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দেড় মাস ধরে গ্যাসের সংকট চললেও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ভোক্তাদের অসন্তোষ আরও বাড়াবে বলেও মত তাঁর।
রান্নার গ্যাসের পাশাপাশি যানবাহনে ব্যবহৃত অটো গ্যাসের দামও বাড়িয়েছে বিইআরসি। প্রতি লিটার অটো গ্যাসের দাম ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯১ টাকা ৯৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, অর্থাৎ লিটারপ্রতি বেড়েছে ৭ টাকা ৩৩ পয়সা। এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন খাতেও পড়তে পারে, কারণ অটো গ্যাসচালিত যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপর এসে পড়ে।



