ইরান যুদ্ধে মার্কিন তেল কোম্পানির মুনাফা ১৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল, বাড়তি বোঝা ভোক্তার কাঁধে
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর মুনাফা ১৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাড়তি ব্যয়ের বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে — যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শুধু পেট্রল ও ডিজেল কিনতেই মার্কিন ভোক্তাদের অতিরিক্ত ১৫০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, পরিবারপ্রতি যা ১ হাজার ১৫০ ডলারের বেশি।
সোমবার (২ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে দেশটির ৫১টি বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মুনাফা করেছে। আগের বছরের একই সময়ে তাদের মুনাফা ছিল ৪৭ বিলিয়ন ডলারের কম।
অন্যদিকে ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ক্লাইমেট সলিউশনস ল্যাবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ পেট্রল ও ডিজেল কিনতে অতিরিক্ত ১৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন। ফলে একদিকে জ্বালানি কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ছে, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন ভোক্তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত তেলের উৎপাদক ও শোধনাগার — দুই পক্ষই লাভবান হচ্ছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদকরা বেশি দামে তেল বিক্রি করতে পারছেন; একই সঙ্গে ডিজেলসহ পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় শোধনাগারগুলোর আয়ও বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি স্থাপনাগুলো বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।
দেশটির বৃহত্তম দুই তেল কোম্পানি এক্সনমোবিল ও শেভরন ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মুনাফার কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া ভ্যালেরো এনার্জির তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফা আগের তুলনায় ছয় গুণের বেশি বেড়ে ৬ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফিলিপস ৬৬-ও রেকর্ড ত্রৈমাসিক মুনাফার কথা জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল বাব আল-মানদেব প্রণালিতেও নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতা না হলে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা সহজে কাটবে না। লন্ডনভিত্তিক রাবোব্যাংকের জ্যেষ্ঠ জ্বালানি কৌশলবিদ ফ্লোরেন্স স্মিটের মতে, সরবরাহ সংকটের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে আগামী বছরও জ্বালানির দাম উচ্চপর্যায়ে থাকতে পারে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও খাদ্যপণ্যের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, চলতি বছর পণ্যদ্রব্যের দাম ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির উচ্চমূল্য স্বল্প মেয়াদে তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফা ও শেয়ারহোল্ডারদের আয় বাড়াবে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে, এমনকি বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
কূটনৈতিক সমঝোতা না হলে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও ব্যাহত হতে পারে, ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।



