‘টার্বো মুরগি’ নিষিদ্ধ করতে চায় ডেনমার্ক, ইউরোপজুড়ে নিষেধাজ্ঞারও দাবি

দ্রুত বেড়ে ওঠা মুরগির জাত, যাকে ‘টার্বো মুরগি’ বলা হচ্ছে, জাতীয়ভাবে নিষিদ্ধ করার পথে এগোচ্ছে ডেনমার্কের সরকার। একই সঙ্গে এই জাতটি যেন পুরো ইউরোপজুড়ে নিষিদ্ধ হয়, সে দাবিও তুলছে দেশটি।
ডেনমার্কের একজন বড় মুরগি উৎপাদকের বিরুদ্ধে আইন ভাঙার অভিযোগ ওঠার পর দেশটিতে এ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সেই বিতর্কের মধ্যেই সরকারের এই অবস্থান সামনে এসেছে।
গত সপ্তাহে প্রচারিত টিভি২-এর একটি প্রামাণ্যচিত্রে বলা হয়, উৎপাদক ক্রিস্টিয়ান টভেরগার্ড ডেনমার্কের আইন ভেঙেছেন। মুরগিগুলোকে বেশি খেতে উৎসাহিত করতে তিনি সেগুলোকে আইনে নির্ধারিত দৈনিক অন্ধকার সময়ের মাত্র অর্ধেক দিয়েছিলেন বলে প্রামাণ্যচিত্রে অভিযোগ করা হয়। এতে নর্থ জুটল্যান্ডের একটি মুরগির খামারে গোপনে ধারণ করা ভিডিও দেখানো হয়।
‘টার্বো মুরগি’ নামে পরিচিত রস ৩০৮ জাতটি ডেনমার্কের মুরগি উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই জাতের মুরগি মাত্র ৩৩ দিনে প্রায় ৫০ গ্রাম থেকে বেড়ে ২ কেজি ওজনের হয়। এত দ্রুত বৃদ্ধির কারণে মুরগির হাড় ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অন্য জাতের মুরগির একই ওজনে পৌঁছাতে ৪৬ থেকে ৬৩ দিন সময় লাগে।
ডেনমার্কের প্রকৃতি ও প্রাণীকল্যাণমন্ত্রী ক্রিস্টিয়ান রাবজের্গ ম্যাডসেন ডেনমার্কের মানুষকে টার্বো মুরগি না কিনতে নিরুৎসাহিত করেছেন। সম্প্রচারমাধ্যমকে তিনি বলেন, তিনি জাতীয় নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কাজ করতে চান। তবে বিষয়টি আইনি ও অর্থনৈতিক দুই দিক থেকেই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
মন্ত্রী আরও বলেন, এখন তারা জাতীয় নিষেধাজ্ঞার জন্য কাজ করবেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যায়েও নিষেধাজ্ঞার জন্য কাজ করবেন।
অন্যদিকে উৎপাদক ক্রিস্টিয়ান টভেরগার্ড কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। টিভি২-কে তিনি বলেন, নিজের দিকে তাকিয়ে তিনি স্বীকার করছেন যে তিনি কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর কোনো অজুহাত নেই, তবে তিনি এ থেকে শিখতে এবং যেখানে যথেষ্ট ভালো করতে পারেননি, সেখানে সংশোধন করতে পারেন।
টভেরগার্ড জানান, আলোর কর্মসূচি এবং খামারের বেশ কয়েকটি কাজের ধারায় তিনি ইতিমধ্যে সংশোধন এনেছেন; পদ্ধতি ও দায়িত্বের তালিকা আরও কঠোর করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবটি ডেনমার্কে রাজনৈতিক গতি পাচ্ছে এবং বিভিন্ন দলের সমর্থনও পাচ্ছে। তবে শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা সতর্ক করে বলছেন, কার্যকর হতে হলে যেকোনো নিষেধাজ্ঞায় আমদানি করা মুরগিকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
মুরগি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ডানপোর প্রধান নির্বাহী ক্লেমেন্ট হিংকবল রিবেরগার্ড বলেন, ডেনমার্ক একা দ্রুত বেড়ে ওঠা মুরগির উৎপাদন নিষিদ্ধ করলেও দেশটির দোকান, রেস্তোরাঁ ও ভোক্তারা যদি আমদানি করা দ্রুত বেড়ে ওঠা মুরগি কেনা চালিয়ে যেতে পারেন, তাহলে প্রাণীকল্যাণের কোনো উপকার হবে না।
ইউরোগ্রুপ ফর অ্যানিম্যালসের হিসাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে এখন ৯৫ শতাংশ মুরগিই নিবিড় পদ্ধতিতে পালন করা হয় এবং সবচেয়ে কম খরচে মাংস উৎপাদনের জন্য সেগুলোর প্রজনন করা হয়। সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী রেইনেকে হামেলিয়ার্স বলেন, দ্রুত বেড়ে ওঠা জাতগুলো স্বভাবতই কষ্টের ঝুঁকিতে থাকে; শরীর এত দ্রুত বাড়ে যে সেগুলো নিজের পায়ে ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারে না। ডেনমার্কের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুসরণ করা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অ্যানিম্যাল প্রোটেকশন ডেনমার্কের প্রধান নির্বাহী ব্রিটা রিস টার্বো মুরগিকে গভীরভাবে অনৈতিক ও বিকৃত ধরনের প্রজননের ফল বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এতে পদ্ধতিগত নির্যাতন ও মুরগিগুলোর ব্যাপক কষ্ট হয়। সংগঠনটি সব মুরগিকে জৈব জাতের মতো একই সময় ধরে, অর্থাৎ ৫৬ দিন, বড় করার দাবি জানাচ্ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডেনমার্কের জনপরিসরে প্রাণীকল্যাণের বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। শূকর পালনের বিষয়টি দেশটির সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে এতটাই প্রাধান্য পেয়েছিল যে নির্বাচনটি ‘শূকর নির্বাচন’ নামে পরিচিতি পায়। বর্তমান সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের ছাড় না চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দেশটি ২০২৯ সালের আগস্টের মধ্যে মিংক পালনও বন্ধ করতে যাচ্ছে।



