ইসরায়েলে অনিশ্চিত নির্বাচনের সপ্তাহ: রেকর্ড ১৯ আসন পেল আরব দলগুলো, হেবরন থেকে সেনা প্রত্যাহার
ইসরায়েলের অনিশ্চিত নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে এক সপ্তাহ ধরে চলছে রাজনৈতিক টানাপোড়েন। নির্বাচনের রাতে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জন্য ছিল বড় সাফল্য—আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো রেকর্ড ১৯টি আসন জিতেছে।
রাম ও জয়েন্ট লিস্টের পক্ষে ভোট দিয়েছেন প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার মানুষ, যা ২০২২ সালের তুলনায় ৬৪ শতাংশ বেশি। এই দুই দলকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের ব্লকের সঙ্গে যোগ করলে নেতানিয়াহু-বিরোধী জোটের আসন দাঁড়ায় ৬৭টিতে; এদের ছাড়া প্রধান জায়নবাদী ব্লকগুলোর মধ্যে ঐক্য চুক্তি অথবা আরেকটি নির্বাচনই বিকল্প হয়ে থাকে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ দল অভিযোগ করেছে, কাতারি অর্থায়নের অপ্রমাণিত দাবি তুলে ফিলিস্তিনি দলগুলো নির্বাচন ‘চুরি’ করেছে। কাতার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, আর পুলিশের সূত্র দ্য টাইমস অব ইসরায়েলকে জানিয়েছে, ব্যাপক জালিয়াতির কোনো প্রমাণ নেই। রোববার নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান নোয়াম সোলবার্গ ঘোষণা দেন, নির্বাচন ‘যথাযথভাবে’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তবে ফিলিস্তিনি ভোটকে অবৈধ প্রমাণের এই বক্তব্য এখন জোট আলোচনায়ও প্রতিফলিত হচ্ছে। ডানপন্থি ইসরায়েল বেইতেনু দলের নেতা আভিগদর লিবারম্যান ফিলিস্তিনি অংশীদারদের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। আইজেনকোট তাঁর জোটে যোগ দেওয়ার জন্য চারটি শর্ত দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলকে ‘ইহুদি, গণতান্ত্রিক, উদার ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি এবং ফিলিস্তিনিসহ সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা—যা ফিলিস্তিনি দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
এর পরও ফিলিস্তিনি রাজনীতিকেরা বাইরে থেকে আইজেনকোট সরকারকে সমর্থন দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে চলেছেন—শুধু নেতানিয়াহু ও কট্টর ডানপন্থিদের বিদায় ঘটানোর জন্য হলেও। এদিকে তেল আবিবে হাজারো মানুষ এমন জোটের দাবিতে সমাবেশ করেছেন, যেখানে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোও থাকবে।
নির্বাচনের অনিশ্চয়তায় ইসরায়েলি ভোটাররা ব্যস্ত থাকলেও অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা নানা ধরনের অবরোধের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন, যার সবচেয়ে বড়টি ছিল হেবরনে। আল জাজিরার ডেটা ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবরের মধ্যে শহরের ১০টি প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
শুক্রবার পর্যন্ত হেবরনে অন্তত ১২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৩টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়; ওই দিন সেনারা একটি হামলার জন্য দায়ী করা দুই ব্যক্তির বাড়িও বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয়। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, বসতি স্থাপনকারীদের ভোট টানতে সরকার এই অভিযান চালিয়েছে; কোনো ইসরায়েলি কর্মকর্তা খোলাখুলি তা বলেননি।
২ নভেম্বর গভর্নর খালেদ দুদিন ঘোষণা দেন, সেনাবাহিনী হেবরন থেকে সরে গেছে এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো ফিরতে পারবে। দ্য জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, সেনাপ্রধান নির্বাচনের আগেই হেবরন ছাড়ার সুপারিশ করেছিলেন, কিন্তু নেতানিয়াহু তা নাকচ করে দেন।
অভিযান শেষ হলেও ক্ষতি থেকে গেছে: ১২০ জনের বেশি গ্রেপ্তারের পাশাপাশি গভর্নরের হিসাবে প্রতিদিনের অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ শেকেল (৩২ লাখ থেকে ৩৮ লাখ ডলার)—আর হেবরন ফিলিস্তিনি শিল্প উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশের জন্য দায়ী।
হেবরন ছিল সবচেয়ে বড়, তবে পশ্চিম তীরজুড়ে আরও অনেক এলাকা বন্ধ রয়েছে। মাসাফের ইয়াত্তায় অন্তত ১২টি গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, আর ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, রোববার বাহিনী জিনবা স্কুলের ১০ জন শিক্ষককে আটক করে।
ওয়াদি রাখিমে চার সপ্তাহ ধরে পরিবারসহ বাড়িতে অবরুদ্ধ ইউসুফ শানারান সোমবার আল জাজিরাকে বলেন, বসতি স্থাপনকারীরা এখন তাঁর বাড়ির বাইরের কূপে বিষ মিশিয়েছে, যে কূপে অবরোধের কারণে পরিবারটি এমনিতেই বারবার পৌঁছাতে পারছিল না। তিনি বলেন, ‘পানি নেই, খাবার নেই, আমার কাছে কিছুই নেই। কেউ আমাদের কাছে কিছু আনতেও পারছে না।’
এই অবরোধের মধ্যেই পশ্চিম তীরজুড়ে জলপাই সংগ্রহে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছেন বসতি স্থাপনকারীরা এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ইসরায়েলি বাহিনীও। জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) অক্টোবরের প্রথম ২৬ দিনে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতিসহ ৩৯৭টি বসতি স্থাপনকারী হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে—২০০৬ সালে সংস্থাটি এ ধরনের ঘটনা গণনা শুরুর পর থেকে এটি মাসিক সর্বোচ্চ।
গাজায় প্রতিদিন হামলা অব্যাহত রয়েছে। ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় সতর্ক করে বলেছে, ফিলিস্তিনিদের ক্রমশ ছোট এলাকায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং ‘ইয়েলো লাইন’কে পশ্চিম দিকে সরে যাওয়া একটি ‘হত্যাঞ্চল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ২ নভেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গত বছরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৫৯৩।
সপ্তাহের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন ছিল রোববার, সেদিন অন্তত আটজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন শনিবার নুসেইরাতের উত্তরে নিহত দিয়া আবু আল-রুস—ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাঁকে হামাসের নুখবা বাহিনীর সদস্য দাবি করলেও ফিলিস্তিনি প্রতিবেদনে তাঁকে শিক্ষক বলা হয়েছে—এবং একই দিন খান ইউনিসে তাঁবুতে হামলায় নিহত মোহাম্মদ কুদেইহ। শুক্রবার আল-মাওয়াসিতে তাঁবুর আগুনে পুড়ে দুই শিশুকন্যা মারা গেছে।
শীত এগিয়ে আসায় মানবিক অবস্থারও উন্নতি হচ্ছে না। গাজার সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রায় ২ লাখ তাঁবু প্রয়োজন, অথচ ইসরায়েলি প্রবেশ-নিষেধাজ্ঞার কারণে এসেছে মাত্র কয়েক ডজন। গাজায় কোনো হাসপাতালই পুরোপুরি চালু নেই; রেড ক্রিসেন্ট সোমবার সতর্ক করে বলেছে, ২৬টি হাসপাতাল সেবার বাইরে চলে যাওয়ার পর জ্বালানি সংকটে বাকিগুলোও হুমকিতে পড়ায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।


