মেয়ে সিমির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চান মা, থানায় হয়রানির অভিযোগ

তেরো বছর বয়সী মেয়ে সিমির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন তার মা চাঁদনী। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি এই দাবি তুলে ধরেন।
চাঁদনীর অভিযোগ, মৃত্যুর আগে সিমির ওপর শারীরিক নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জোরপূর্বক মাদক সেবন, ধর্ষণ এবং ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা ঘটেছিল। এসব অভিযোগ নিয়ে থানায় গিয়েও পুলিশের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগিতা পাননি বলে তিনি দাবি করেছেন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, রাজধানীর মহাখালীর একটি বাসায় মেয়েকে নিয়ে থাকতেন তিনি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে দারোয়ানের মাধ্যমে সাইদুর ও টুম্পা নামের এক দম্পতি তাদের দুই সন্তানসহ ওই বাসায় সাবলেট হিসেবে ওঠেন। তাদের ঘিরে নানা ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হলে তারা ১ মে বাসা ছেড়ে চলে যান। পরে ওই দম্পতির মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা তিনি জানতে পারেন বলে দাবি করেন।
চাঁদনীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২০ মে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে সিমি স্কুলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়। দুপুর গড়িয়ে গেলেও বাসায় না ফেরায় তিনি স্কুলে খোঁজ নেন। সেখানে মেয়ের কোনো তথ্য না পেয়ে সন্ধ্যায় বনানী থানায় নিখোঁজের বিষয়টি জানান। এরপর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রফিক তদন্ত শুরু করেন।
তিনি বলেন, ওই দিন রাত আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে পুলিশ সিমিকে তার কাছে ফিরিয়ে দেয়। এ সময় একটি কাগজে তার স্বাক্ষর নেওয়া হলেও মেয়েকে কীভাবে বা কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, তা তাকে জানানো হয়নি। এমনকি সিমিকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেও নিষেধ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে মেয়ের সঙ্গে কথা বলে তিনি নির্যাতন, জোরপূর্বক মাদক সেবন, ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগের কথা জানতে পারেন বলে জানান চাঁদনী।
তিনি বলেন, এসব বিষয়ে অভিযোগ জানাতে গত ৮ জুলাই বিকেল পৌনে চারটার দিকে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বনানী থানায় যান। তখন দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক শাকিল তাদের বক্তব্য শোনেন। তবে সিমিকে উদ্ধার করেছিলেন এসআই রফিক, তাই তিনি এলে বিষয়টি দেখবেন বলে জানানো হয়। পরে রফিক থানায় এলে তাকে পুরো ঘটনা জানানো হয় এবং সাইদুর ও টুম্পার ছবি দেখানো হয়। এরপরও ওই দিন রাত আটটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনো সমাধান পাননি তারা। পরদিন আসতে বলা হয়। এভাবে দিনের পর দিন তাকে ঘোরানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন চাঁদনী।
তার দাবি, পরবর্তী সময়ে পুলিশ তাদের থানায় যাওয়ার বিষয়টিই অস্বীকার করে। সিমির মৃত্যুর আগে এ ধরনের কোনো অভিযোগ নিয়ে কেউ থানায় যাননি বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
চাঁদনী জানান, গত ১৫ জুলাই রাতে বাসায় ফেরার পর মেয়ের আচরণে কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ করেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিমি রাগ করে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। অনেক ডাকাডাকির পরও দরজা না খোলায় প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা খোলা হয়। তখন সিমিকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরদিন ১৬ জুলাই মেয়ের মরদেহ নিয়ে বনানী থানায় যান চাঁদনী। তার অভিযোগ, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর পুলিশ মরদেহ নামিয়ে তার অভিযোগ গ্রহণ না করে অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করে। এ ঘটনায় আদালতে মামলা করার আবেদন জানালে আদালত তাকে জানায়, নতুন করে মামলা করার সুযোগ নেই। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তাতে সন্তুষ্ট না হলে তিনি পুনঃতদন্তের আবেদন করতে পারবেন।
চাঁদনী বলেন, তার অভিযোগের একটি অংশ পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে পুলিশের তদন্তেই ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে তার উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি সিমির ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক তথ্য, ডিজিটাল প্রমাণ, মোবাইল ফোনের তথ্য, সম্ভাব্য ভিডিও এবং সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনার মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের দাবি জানান। পাশাপাশি নির্যাতন, ধর্ষণ, জোরপূর্বক মাদক সেবন ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত চান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে চাঁদনী আট দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে সিমির মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, অভিযোগে উল্লেখ করা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তদন্তের আওতায় আনা, বনানী থানায় অভিযোগ জানানো নিয়ে তার ও পুলিশের বক্তব্যের অমিল যাচাই এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অসদাচরণের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
এ ছাড়া ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক তথ্যসহ সব ধরনের প্রাসঙ্গিক আলামত আইনসম্মতভাবে সংগ্রহ ও পরীক্ষা, নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাদের অবহিত রাখার দাবি জানান তিনি। চাঁদনী বলেন, তিনি কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে চান না; শুধু চান সত্য ঘটনা সামনে আসুক এবং কোনো অবহেলা হয়ে থাকলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত হোক।




