খাদ্য রপ্তানিতে ব্রেক্সিট-পরবর্তী পরীক্ষা তুলে নিতে খসড়া চুক্তিতে একমত যুক্তরাজ্য ও ইইউ

যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) খাদ্য ও কৃষিপণ্য রপ্তানির ওপর থেকে ব্রেক্সিট-পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষা তুলে নেওয়ার বিষয়ে একটি খসড়া চুক্তিতে একমত হয়েছে। এ মাসের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনের আগেই এই অগ্রগতি এল।
বিবিসি জানিয়েছে, এই তথাকথিত ‘এসপিএস’ (স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি) চুক্তির ২০০ পৃষ্ঠার খসড়া পাঠ ব্রাসেলসে ইইউ দেশগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে, যা বুধবারের এক বৈঠকে বিবেচনা করা হবে।
এর পাশাপাশি নিঃসরণ বাণিজ্য (এমিশনস ট্রেডিং) এবং তরুণদের ভ্রমণ ও কাজের সুযোগসংক্রান্ত চুক্তির খসড়া পাঠও পাঠানো হয়েছে। সেই সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও ইইউ শীর্ষ নেতাদের জন্য ১৫ পৃষ্ঠার একটি খসড়া যৌথ বিবৃতিও পাঠানো হয়েছে।
এই খাদ্য চুক্তিকে এখন পর্যন্ত সম্মত হওয়া তথাকথিত ‘ব্রেক্সিট রিসেট’-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলা হচ্ছে। যুক্তরাজ্য ইইউর একক বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর রপ্তানিকারকদের যেসব পরীক্ষা ও জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছিল, এই চুক্তি সেগুলো সরিয়ে দেবে।
চুক্তি কার্যকর হলে ২০০ পাউন্ডের রপ্তানি স্বাস্থ্য সনদ, ২৫ পাউন্ডের ফাইটোস্যানিটারি সনদ, পরিদর্শকের ফি, জৈব সনদ, কিছু বন্দর ফি, নমুনা পরীক্ষার ফিসহ ইইউতে রপ্তানি ও সেখান থেকে আমদানির ক্ষেত্রে নানা পরীক্ষার প্রয়োজন থাকবে না।
এর ফলে যুক্তরাজ্যের তাজা সসেজ, বার্গার, দেশীয় জলসীমার শেলফিশ এবং বীজ আলুর রপ্তানি ইইউতে আবার শুরু করা যাবে।
সরকারের দাবি, এই চুক্তির ফলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি বছরে ৫১০ কোটি পাউন্ডের সুবিধা পাবে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাজ্যের পোষা প্রাণীর পাসপোর্ট নিয়ে ইইউতে যাওয়া যাবে। একই সঙ্গে উদ্ভিদ, প্রাণী ও খাদ্য বাণিজ্যের মান নিয়ে বিদ্যমান ইইউ বিধি পর্যবেক্ষণ ও সেগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে যুক্তরাজ্য। এই প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে ‘ডায়নামিক অ্যালাইনমেন্ট’।
ব্রিটিশ সরকার এরই মধ্যে একটি ইউরোপীয় অংশীদারিত্ব বিল ঘোষণা করেছে, যা নতুন ইইউ বিধি প্রয়োগের আইনি কাঠামো দেবে। এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের নিঃসরণ বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ইইউর ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যাবে এবং যুক্তরাজ্যের রপ্তানিকারকদের ইইউর নতুন কার্বন সীমান্ত কর দিতে হবে না।
খসড়া চুক্তিগুলো বুধবার ইইউ রাষ্ট্রদূতদের ‘কোরপার’ বৈঠকে আলোচনা হবে। ‘ইয়ুথ এক্সপেরিয়েন্স স্কিম’-এ অংশগ্রহণকারীর সংখ্যার মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক পর্যায়ে চূড়ান্ত করা হবে। ইইউ শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশি শিক্ষার্থী ফির পুরো ছাড়ের প্রস্তাব সম্ভবত আগামী বছর পর্যন্ত পিছিয়ে যাবে; বিদ্যুৎ বাজার পুনঃসংযোগের পরিকল্পনাও একইভাবে পেছানো হতে পারে।
বিবিসি জানিয়েছে, খসড়া চুক্তিগুলোতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রকল্পে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ডেটাবেইসে প্রবেশাধিকার এবং ইইউর ‘মেড ইন ইউরোপ’ পরিকল্পনা নিয়ে কিছু আশ্বাসের উল্লেখও থাকবে।
এই খাদ্য চুক্তির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্য। এর ফলে ব্রেক্সিট-পরবর্তী আইরিশ সাগর সীমানার প্রভাব অনেকটাই কমে যাবে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ব্রেক্সিট চুক্তি অনুযায়ী অঞ্চলটি পণ্যের ক্ষেত্রে ইইউর একক বাজারের ভেতরেই রয়ে গেছে। ফলে যুক্তরাজ্যের অন্য অংশ থেকে আসা খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে সেখানকার বন্দরে কাগজপত্র ও কিছু বাস্তব পরীক্ষা প্রয়োজন হয়। এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত সেই প্রয়োজনীয়তা দূর করবে।
সুপারমার্কেট ও কৃষক প্রতিনিধিরা খাদ্য বাণিজ্য পরিকল্পনাকে সমর্থন জানালেও কিছু ব্রেক্সিটপন্থী প্রচারক ইইউ বিধি পুনরায় প্রয়োগের সমালোচনা করেছেন। বরিস জনসনের সরকারের স্বাক্ষর করা ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাণিজ্য চুক্তিতে নতুন বিধিগত জটিলতা, পরীক্ষা ও বিলম্ব এড়ানোর চেয়ে বিধিগত স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।
তবে ব্রিটিশ চেম্বার অব কমার্সের (বিসিসি) বাণিজ্য নীতি প্রধান উইলিয়াম বেইন বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানকে বলেছেন, ব্যবসায়ীদের সামগ্রিক মত হলো অভিন্ন বিধি মেনে চলার মূল্য দেওয়াটা সার্থক, কারণ এতে কোম্পানিগুলো কম খরচ, কম বিলম্ব ও বেশি বাজার-সুবিধা পাবে।
তিনি বলেন, এখন রপ্তানি স্বাস্থ্য সনদের প্রয়োজনীয়তার কারণে পণ্যবাহী প্রতিটি ট্রাকে হাজারো পাউন্ড অতিরিক্ত খরচ যোগ হয়, সেই সঙ্গে বন্দর বা সীমানায় বিলম্ব তো আছেই। তার ভাষায়, এই বিলম্ব ও খরচের বিশাল বৃদ্ধির কারণে রপ্তানি কমে যাচ্ছে।




