পার্লামেন্টের ৪০ লাখ নথি গেল ব্রিটেনের জাতীয় আর্কাইভে, তার মধ্যে গানপাউডার ষড়যন্ত্রের ১৬০৫ সালের আইনও

ব্রিটেনের পার্লামেন্টের আর্কাইভ থেকে ৪০ লাখ নথি জাতীয় আর্কাইভে হস্তান্তরের কাজ শেষ হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের কিউতে অবস্থিত জাতীয় আর্কাইভে নথিগুলো নেওয়ার এই প্রকল্প পাঁচ বছর আগে শুরু হয়েছিল, এখন তা সম্পূর্ণ হয়েছে। বনফায়ার নাইট ঘনিয়ে আসা এবং যুক্তরাজ্যজুড়ে আতশবাজির প্রদর্শনীর সময়েই এই সংগ্রহের উল্লেখযোগ্য নথিগুলোর কথা সামনে এসেছে।
সংগ্রহের অন্যতম নথি ১৬০৫ সালের থ্যাঙ্কসগিভিং অ্যাক্ট। সে বছর পার্লামেন্টের উদ্বোধনের সময় রাজা, লর্ডস ও কমন্সকে হত্যার গাই ফক্সের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর রাজা প্রথম জেমস এই আইন পাস করেন।
আইনটিতে প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের রক্ষা পাওয়াকে উদ্যাপন করা হয়েছিল এবং গানপাউডার ষড়যন্ত্রের ব্যর্থতা স্মরণে প্রতি বছর ৫ নভেম্বর গির্জায় প্রার্থনা অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নথিটি সুন্দর হস্তলিপিতে লেখা একটি সমতল ভেলম পাতায় সংরক্ষিত আছে জাতীয় আর্কাইভে।
জাতীয় আর্কাইভের আধুনিক যুগের শুরুর পার্লামেন্টবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. গ্রাহাম মুর বলেছেন, এসব আইনের শুরু অংশ প্রায়ই খুব অলংকৃত ভাষায় লেখা থাকে; প্রথম অংশে আইন প্রণয়নের কারণ বলা হয়, তারপর আসে মূল আইনি বিধান। তিনি প্রথম জেমসকে নিয়ে আইনের একটি রসিকতাপূর্ণ অংশের কথাও উল্লেখ করেছেন।
সংগ্রহে আছে হাউস অব কমন্সের একটি অত্যন্ত সুসংরক্ষিত জার্নাল, যা হ্যানসার্ডের পূর্বসূরি। এর মার্জিনে ১৬০৫ সালের ৫ নভেম্বর কমন্সের কেরানির হাতে লেখা একটি নোটে ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদের ভূগর্ভস্থ কক্ষে তল্লাশি এবং গাই ফক্সসহ ৩৬ ব্যারেল গানপাউডার আবিষ্কারের কথা বলা হয়েছে।
আরেকটি স্ক্রলে আছে ‘অ্যাটেইন্ডার অ্যাক্ট’, যাতে গাই ফক্স ও তার সহ-ষড়যন্ত্রকারীদের রাষ্ট্রদ্রোহে দোষী ঘোষণা করে ফাঁসি, টেনে নেওয়া ও চার টুকরো করার শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছিল।
ড. মুর বলেছেন, ভেলমের ওপর ছোট ছোট সংযোজন সেলাই করা দেখা যায়; বিলটি হাউসে তোলার পর বিতর্কের সময় সম্পাদনার ফলেই কাটাছেঁড়া ও সংযোজনগুলো এসেছে।
প্যালেস অব ওয়েস্টমিনস্টারের ভিক্টোরিয়া টাওয়ার থেকে কিউতে নথি স্থানান্তরে জাতীয় আর্কাইভে যোগ হয়েছে ১৬ দশমিক ৫ রৈখিক কিলোমিটার নথি; সেখানে আগে থেকেই ছিল ১৭৪ দশমিক ৫ রৈখিক কিলোমিটার নথি। সব নথি এখন সম্পূর্ণ তালিকাভুক্ত, প্রতিটিতে নিজস্ব নিবন্ধন বারকোড দেওয়া হয়েছে এবং জনসাধারণ বিনা খরচে অর্ডার করে দেখতে পারবেন।
নথির বাইরে অস্বাভাবিক জিনিসও এসেছে সংগ্রহে—একটি সমাধিপ্রস্তরের টুকরো, একটি তলোয়ার ও একটি ইউনিফর্ম। আছে ১৯০৮ সালের ২৮ অক্টোবরের একটি ভোটাধিকার আন্দোলনকারীর ব্যানার, যা গোপনে কমন্স কক্ষের লেডিস গ্যালারিতে নেওয়া হয়েছিল; একজন আন্দোলনকারী ব্যানারটি কক্ষে ফেলে দেন এবং অন্য দুজন গ্যালারির লোহার গ্রিলে নিজেদের শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলেন, পরে গ্রিলটি তাদেরসহই সরাতে হয়েছিল।
সংগ্রহের সবচেয়ে বড় নথি ১৮২১ সালের ল্যান্ড ট্যাক্স কমিশনার্স অ্যাক্ট, পার্লামেন্টের আর্কাইভের দীর্ঘতম আইন। ভূমি মূল্যায়নের ভিত্তিতে রাজস্ব আদায়ে এতে ৬৫ হাজার কমিশনারের নাম দেওয়া হয়েছে; ৭৫৭টি ভেলম পর্দায় লেখা আইনটির মোট দৈর্ঘ্য ৩৪৮ মিটার, তিনটি ফুটবল মাঠের বেশি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি ১৮৩২ সালের গ্রেট রিফর্ম অ্যাক্ট। জাতীয় আর্কাইভের ঊনবিংশ শতাব্দীর পার্লামেন্ট নথিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. জো কোজেন্স এটিকে সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন, কারণ এই আইনেই প্রথমবার বরো শহরের মধ্যবিত্ত পুরুষেরা ভোটাধিকার পান।
জাতীয় আর্কাইভের কাছে এখন মোট ২ কোটি নথি রয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশ চেশায়ারের গভীর সংরক্ষণাগারে রাখা। প্রধান নির্বাহী সল নাসে বলেছেন, প্যালেস অব ওয়েস্টমিনস্টার আধুনিক সংরক্ষণ মানের জন্য তৈরি নয়; বিচার বিভাগ ও সরকারের নথির সঙ্গে পার্লামেন্টের নথি যুক্ত হওয়ায় ব্রিটিশ রাষ্ট্রের তিনটি বাহু এখন এক জায়গায় এসেছে এবং জনসাধারণ আগের চেয়ে বেশি প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন।




