ইউরোপের ফ্রিজ হ্যাকের ছোঁয়া এবার ব্রিটেনের খাদ্য সরবরাহেও, সতর্ক করলেন দেশটির সাইবারপ্রধান

ইউরোপজুড়ে সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজারে চালানো সাইবার হামলার প্রভাব এবার যুক্তরাজ্যের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যবসাগুলোতেও পড়েছে। সোমবারের ওই হামলায় বিভিন্ন দেশের সুপারমার্কেটের শীতলীকরণ ইউনিটের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার (এনসিএসসি) জানিয়েছে, দেশটিতে ‘গুটিকয়েক ক্ষেত্রে’ দুর্বল প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে হামলা চালানোর বিষয়ে তারা অবগত আছে।
এনসিএসসির প্রধান নির্বাহী ড. রিচার্ড হর্ন বিবিসি রেডিও ফোরের টুডে অনুষ্ঠানে বলেছেন, যুক্তরাজ্যে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করতে তারা ‘সারা রাত ধরে কাজ করেছেন’।
ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট মিট সাপ্লায়ার্স (এআইএমএস) বিবিসিকে জানিয়েছে, তাদের ৩০০-র বেশি সদস্যের কেউ কেউ এই হ্যাকের পরোক্ষ শিকার হয়েছেন। সংগঠনটির যোগাযোগপ্রধান টনি গুজার বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের কারও কোনো মাংস নষ্ট হয়নি; তবে ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিল, সরবরাহ শৃঙ্খলের যেকোনো পর্যায়ের ব্যবসাই হামলাকারীদের লক্ষ্য হতে পারে। সদস্যসহ পুরো খাতকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার আয়ারল্যান্ড, সুইডেন, এস্তোনিয়া ও বেলজিয়ামসহ বিভিন্ন দেশের সুপারমার্কেট থেকে ফ্রিজের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার খবর আসে। বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গে ডেলহেজের প্রায় ৪০টি সুপারমার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়; সুইডেন, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, এস্তোনিয়া ও ফিনল্যান্ডে অপেক্ষাকৃত কমসংখ্যক দোকান আক্রান্ত হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি ফ্রিজের নির্মাতা বেলজিয়ামের প্রতিষ্ঠান স্যাবকোবেল জানিয়েছে, ইউনিটগুলোর ইভাপোরেটর ডিফ্রস্ট মোডে চালু করে দেওয়া হয়েছিল, ফলে সেগুলো গরম হয়ে ওঠে। গত মাসে ফ্রান্সের ঘটনাতেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অক্টোবরের শুরুর দিকে ফ্রান্সজুড়ে সুপারমার্কেট ও খাদ্য সরবরাহকারীদের ওপর চালানো হামলার পরের ঘটনা এটি। ওই রাতের হামলায় শত শত দোকান লক্ষ্যবস্তু হয় এবং কয়েক মিলিয়ন ইউরো মূল্যের তাজা ও হিমায়িত খাবার নষ্ট হয়। তখন দূর থেকে শীতলীকরণ ইউনিট নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থার এমন দুর্বলতা কাজে লাগানো হয়েছিল, যা সাইবার নিরাপত্তা গবেষকেরা কয়েক মাস আগেই চিহ্নিত করেছিলেন।
সোমবারের ঘটনাতেও অনেক খুচরা বিক্রেতাকে নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার ফেলে দিতে হয়েছে; কারও কারও ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক লাখ ইউরো মূল্যের পণ্য। বেলজিয়ামে ডেলহেজ সুপারমার্কেট পরিচালনাকারী ম্যাথিউ টিলমান বিবিসিকে বলেছেন, ঘটনাটি তার কাছে ‘সত্যিই মর্মান্তিক’; এত মানুষের খাবারের অভাব থাকা সত্ত্বেও এত খাবার ফেলে দিতে হচ্ছে, এমন মুহূর্তে চাকরি ছেড়ে দিতেও মন চায় বলে জানান তিনি।
হামলার পেছনে কারা আছে, সে বিষয়ে মঙ্গলবার হর্ন বলেছেন, এখনই কিছু বলার সময় হয়নি। তবে দৈনন্দিন নানা কাজে ব্যবহৃত প্রযুক্তি নিরাপদ ও হালনাগাদ রাখার জরুরি প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করেছেন তিনি।
হর্নের ভাষ্য, সমাজ হিসেবে মানুষ যে প্রযুক্তিভিত্তির ওপর নির্ভর করে, তাতে প্রয়োজনীয় মাত্রায় বিনিয়োগ করা হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাগুলোর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়ার পরও সেগুলো ব্যবহার করেছে, হালনাগাদ করেনি, আবার ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন নিরাপদ পরিসরে রাখেনি। এমন দুর্বলতা হ্যাকারদের জন্য সহজ লক্ষ্য, আর প্রতিপক্ষের হাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থাকলে এগুলো আরও দ্রুত ও সহজে খুঁজে কাজে লাগানো যায় বলেও সতর্ক করেন তিনি। সব প্রতিষ্ঠানকে তাদের নির্ভরশীল প্রযুক্তি পর্যালোচনা করে নবায়নে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি; শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি প্রতিটি ব্যবসার নিজেরই নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন হর্ন।
যুক্তরাজ্যে এখন পর্যন্ত এ ধরনের বড় ধরনের প্রভাবের লক্ষণ প্রায় দেখা যায়নি। ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়ামের নিয়ন্ত্রণবিষয়ক সহকারী পরিচালক গ্রাহাম উইন বলেছেন, খুচরা বিক্রেতারা সাইবার নিরাপত্তায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেন এবং ফ্রিজ-ফ্রিজার যতটা সম্ভব নিরাপদ রাখতে বর্তমানে তারা এনসিএসসির সঙ্গে কাজ করছেন। আসডা, লিডল, এমঅ্যান্ডএস, সেইন্সবারিস ও টেসকো এই বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে।




