লুইজিয়ানার শিল্পদূষণপ্রবণ এলাকায় জন্মানো শিশুদের হৃদ্ত্রুটির ঝুঁকি চার গুণের বেশি: গবেষণা

যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের যেসব এলাকায় শিল্পদূষণের মাত্রা বেশি, সেখানকার মায়েদের শিশুদের গুরুতর জন্মগত হৃদ্ত্রুটি নিয়ে জন্মানোর আশঙ্কা কম দূষণের এলাকার শিশুদের তুলনায় চার গুণের বেশি। নিউ অরলিন্সের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের তথ্য নিয়ে করা এক গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে।
গত সপ্তাহে ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটিতে লুইজিয়ানার দুটি বড় হাসপাতালের চিকিৎসা নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এই দুটি হাসপাতালেই শিশুদের হৃদ্ত্রুটির অস্ত্রোপচার করা যায়। গবেষকেরা সেখানে ভর্তি ৪৫৪টি শিশুর তথ্য নিয়েছেন এবং তাদের মায়েরা কোথায় থাকতেন, তা খুঁজে বের করেছেন।
গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার (ইপিএ) ঝুঁকি-যাচাইয়ের তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে ওই মায়েদের এলাকায় শিল্পকারখানার বিষাক্ত দূষণের মাত্রা মেপেছেন। তাতে দেখা গেছে, কম দূষণের এলাকার শিশুদের তুলনায় বিষাক্ত দূষণের ‘হটস্পট’ এলাকার শিশুদের জন্মগত হৃদ্ত্রুটির সম্ভাবনা ৪ দশমিক ৩ গুণ বেশি। মাঝারি মাত্রার দূষণের এলাকায় এই সম্ভাবনা ৩ দশমিক ১ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শিশুদের কেউ কেউ শিশু হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কেলি গাজেউস্কির রোগী। তিনি ম্যানিং ফ্যামিলি চিলড্রেনস হাসপাতালে কাজ করেন এবং লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের অধ্যাপক। তিনি বলেছেন, একটি শিশুর জন্মগত হৃদ্রোগ থাকা পরিবারের জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয়।
ডা. গাজেউস্কি এক দশকের বেশি আগে লুইজিয়ানায় আসার পর তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি শিশুদের গুরুতর জন্মগত হৃদ্রোগের রোগী অনেক বেশি দেখছেন। তাঁর সন্দেহ হয়, এই অঙ্গরাজ্যে এমন কিছু আছে, যা এই হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেই সন্দেহ থেকেই তিনি পরিবেশগত কারণ খুঁজতে শুরু করেন।
গবেষণাটির প্রধান লেখক কিম্বারলি টেরেল এনভায়রনমেন্টাল ইন্টেগ্রিটি প্রজেক্টের গবেষণা বিজ্ঞানী। তিনি বলেছেন, এই গবেষণা দেখাচ্ছে শিল্পদূষণের প্রভাব লুইজিয়ানার মানুষের স্বাস্থ্যে গর্ভাবস্থা থেকেই শুরু হয়। তাঁর ভাষায়, গুরুতর স্বাস্থ্য প্রভাব বলতে মানুষ সাধারণত ক্যানসার ও দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগের কথা ভাবে, যেগুলো দীর্ঘদিনের সংস্পর্শে আসে; কিন্তু বিকাশজনিত প্রভাব আসে তুলনামূলক স্বল্প সময়ের সংস্পর্শ থেকেই।
টেরেল আরও বলেছেন, গর্ভাবস্থার শুরুর দিকটাই হৃদ্যন্ত্র ও শরীরের অন্যান্য তন্ত্রের বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেই কারণে প্রায় তিন মাসের এই সংকীর্ণ সময়ে দূষণের সংস্পর্শ কমানো খুবই জরুরি।
গবেষকেরা ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে জন্মানো শিশুদের তথ্য নিয়েছেন। তাঁদের মায়েদের বেনজিন, ফরমালডিহাইড ও টলুইনসহ প্রাথমিক বিকাশে ক্ষতিকর বলে পরিচিত ২০টি বিষাক্ত পদার্থের সম্ভাব্য সংস্পর্শ বিবেচনা করা হয়েছে। গর্ভাবস্থায় ধূমপান, মদ্যপান বা ডায়াবেটিসের তথ্য ছিল, এমন ঘটনাগুলো গবেষণা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এই বাদ দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে টেরেল বলেছেন, তাঁরা সেই জন্মগুলোর ওপর মনোযোগ দিতে চেয়েছিলেন, যেগুলো সুস্থ হওয়ার কথা ছিল। তাঁর দাবি, ধূমপান, মদ্যপান বা ডায়াবেটিস দিয়ে এই ঝুঁকিকে ব্যাখ্যা করা যায় না, এ কথা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলা যায়।
লুইজিয়ানায় শিশুমৃত্যুর হার ও শিল্পনির্গমনের হার যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি পর্যায়ের দিকে। আগের গবেষণাগুলোতে এই অঙ্গরাজ্যের বিষাক্ত বায়ুদূষণের সঙ্গে কম ওজন নিয়ে শিশু জন্মানো এবং কৃষ্ণাঙ্গ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্যানসারের উচ্চ হারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অঙ্গরাজ্যটিতে বিষাক্ত দূষণের সবচেয়ে বড় উৎস পেট্রোরাসায়নিক কারখানাগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি ১৫ মিনিটে একটি শিশু হৃদ্ত্রুটি নিয়ে জন্মায়। গুরুতর ধরনের হৃদ্ত্রুটি নিয়ে জন্মানো শিশুদের প্রায় ১৫ শতাংশ জীবনের প্রথম বছর পার করতে পারে না। এই গবেষণার ৪৫৪টি শিশুর মধ্যে ১৯৪টির ত্রুটি ছিল গুরুতর এবং গবেষণাকালের মধ্যে ৩৮টি শিশু মারা গেছে।
ডা. গাজেউস্কি বলেছেন, আধুনিক চিকিৎসা গুরুতর হৃদ্ত্রুটি নিয়ে জন্মানো অনেক শিশুর জীবন বাঁচাতে পারলেও এই শিশুদের প্রায় সবাইকেই সারা জীবন বিশেষায়িত চিকিৎসা নিতে হয়। তাদের শেখার অক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, হৃদ্যন্ত্র অকেজো হওয়া বা অন্য অঙ্গের সমস্যার ঝুঁকিও বেশি থাকে। কোনো কোনো রোগীর বাবা-মা সন্তানের চিকিৎসার হাসপাতালের কাছাকাছি থাকতে নিউ অরলিন্সে চলে আসেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।
গবেষক দলটি বলছে, মায়েদের শিল্পদূষণের সংস্পর্শ কমানো গেলে দক্ষিণ-পূর্ব লুইজিয়ানায় প্রাণঘাতী হৃদ্ত্রুটি নিয়ে জন্মানো শিশুর সংখ্যা কমবে। এ বিষয়ে টেরেল বলেছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এটা সম্ভব।




