মুম্বাইয়ে ক্রিস্টিজের প্রদর্শনীতে প্রথমবার প্রকাশ্যে রবীন্দ্রনাথের অদেখা পারিবারিক আর্কাইভ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের শেষ বছরগুলোর সৃজনপ্রক্রিয়া ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের আভাস দেওয়া একটি পারিবারিক আর্কাইভ প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসছে। এতদিন ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা এই উপকরণ নিয়ে চলতি মাসে মুম্বাইয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করছে ক্রিস্টিজ।
‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অ্যান্ড মুংপু’ শিরোনামের এই প্রদর্শনী চলবে ১০ নভেম্বর থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ মুম্বাইয়ে ক্রিস্টিজের নিজস্ব পরিসরে। এতে থাকছে শিল্পকর্ম, পাণ্ডুলিপি, চিঠি, আলোকচিত্র ও কবির ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র।
আর্কাইভটি গড়ে উঠেছে ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে দার্জিলিংয়ের মুংপু গ্রামে কবির স্নেহধন্য মৈত্রেয়ী দেবীর পারিবারিক বাড়িতে তাঁর সফরগুলোকে ঘিরে। রবীন্দ্রনাথ মারা যান ১৯৪১ সালে; ফলে এই উপকরণ তাঁর জীবনের একেবারে শেষ পর্বের সাক্ষ্য বহন করে।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া প্রথম অ-ইউরোপীয়। বাঙালি এই কবি, সংগীতস্রষ্টা, ঔপন্যাসিক, দার্শনিক, গীতিকার, চিত্রশিল্পী, মানবতাবাদী ও শিক্ষাবিদের স্থায়ী উত্তরাধিকারের মধ্যে রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশেরই জাতীয় সংগীত।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন একবার লিখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ‘বাংলার হাজার বছরের সাহিত্যে এক সুউচ্চ ব্যক্তিত্ব’, যাঁর গান পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশজুড়ে অনুরণিত হয় এবং শিক্ষা, জাতীয়তাবাদ ও মনের স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর ভাবনা আজও প্রাসঙ্গিক।
আয়ারল্যান্ডের কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস রবীন্দ্রনাথকে ‘আমাদের সবার চেয়ে বড়’ বলে বর্ণনা করেছিলেন বলে জানা যায়। নোবেল পাওয়ার বছরেই প্রকাশিত ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদ ওই বছরের মার্চে লন্ডনে প্রকাশের পর নভেম্বরে পুরস্কার ঘোষণার আগেই ১০ বার পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল; নোবেল কমিটি কাব্যগ্রন্থটির প্রশংসা করেছিল ‘গভীরভাবে সংবেদনশীল, সতেজ ও সুন্দর কবিতা’ হিসেবে।
প্রদর্শনীর কিউরেটর ও ক্রিস্টিজের দক্ষিণ এশীয় আধুনিক ও সমসাময়িক শিল্প বিভাগের প্রধান নিশাদ আভারি আর্কাইভের নানা দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর নির্দেশ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হলো ১৯৪০ সালের একটি পাণ্ডুলিপি, যা রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথা ‘ছেলেবেলা’র খসড়া বলে মনে করা হচ্ছে; সেখানে কলকাতার এক বড় পরিবারে বড় হওয়া থেকে বিদ্যুৎ ও মোটরগাড়ির যুগে বদলে যাওয়া পৃথিবীর কথা এসেছে।
আভারির মতে, ওই নথিতে শিক্ষা নিয়ে কবির ভাবনা শান্তিনিকেতনে তিনি যে শিক্ষাদর্শ প্রয়োগ করেছিলেন তারই প্রতিধ্বনি। তিনি বলেন, ‘তিনি বলছেন, শিক্ষা যেন কারাগারের মতো না হয়; তা হওয়া উচিত উন্মুক্ত ও মুক্ত... বিস্ময়, এমনকি ভয়ও সৃজনশীলতাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।’ শান্তিনিকেতনের উন্মুক্ত বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা গাছের নিচে বসে গুরুর কাছে পাঠ নিতেন—শিক্ষা সেখানে বাধ্যবাধকতা মনে হতো না।
নথিটির আরেকটি বিশেষত্বের কথাও জানিয়েছেন আভারি। প্রদর্শনীর ১০টি পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপির মধ্যে এটিই একমাত্র যেটি মৈত্রেয়ী দেবীকে শ্রুতিলিখন দিয়ে লেখানো হয়েছিল; মৈত্রেয়ীর বাবা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আভারির ভাষায়, এটি তাঁদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও দেবীর ওপর কবির আস্থার প্রমাণ।
সংগ্রহে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষর করা তাঁর প্রায় প্রতিটি প্রকাশনার কপি এবং শত শত চিঠি—প্রথমে রবীন্দ্রনাথ ও মৈত্রেয়ীর বাবার মধ্যে, পরে রবীন্দ্রনাথ ও মৈত্রেয়ী দেবীর মধ্যে লেখা। সংশোধনীর ফাঁকে ফাঁকে আঁকা ডুডল থেকে বোঝা যায়, কবির সাহিত্যচর্চা কীভাবে তাঁর চিত্রচর্চাকে পুষ্ট করেছে।
শিল্পকর্মের মধ্যে মৈত্রেয়ী দেবীর একটি প্রতিকৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ রবীন্দ্রনাথের মূর্তিচিত্র সাধারণত নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হতো না। রয়েছে মুংপুর অরণ্যের প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবিও, যে জায়গাটিকে কবি বিশ্রামের স্থান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পাশাপাশি থাকছে পুরনো আলোকচিত্র এবং কবির রেখে যাওয়া কুর্তা ও লুঙ্গিসহ ব্যক্তিগত সামগ্রী।
আন্তর্জাতিক শিল্পবাজারে রবীন্দ্রনাথের ছবির চাহিদা উল্লেখযোগ্য। চলতি বছর সোথবিজ তাঁর একটি জলরঙের ছবি ১০ লাখ ২০ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করেছে, যা ছিল সর্বনিম্ন প্রত্যাশিত দামের প্রায় চার গুণ।
শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী ও ন্যাশনাল গ্যালারি অব মডার্ন আর্টের মতো প্রতিষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের আর্কাইভ উপকরণের বড় অংশ থাকায় এমন ব্যক্তিগত আর্কাইভের সন্ধান বিরল। আভারি আশা করছেন, এই উপকরণ প্রকাশ্যে এলে ইতিহাসবিদ, গবেষক ও অনুরাগীরা শিল্পীর পাশাপাশি মানুষ রবীন্দ্রনাথকে বোঝার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পাবেন।



