৬৩৫ নিরাপত্তাকর্মীর পরও শাহ আমানতে থামছে না চুরি: আগস্ট থেকে ১১টি ঘটনায় গেছে ট্রান্সফরমার ও কেব্ল

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চারটি ইউনিটের অধীনে ৬৩৫ জন নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন থাকার পরও একের পর এক চুরির ঘটনা ঘটছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফর উপলক্ষে বসানো ল্যাম্পপোস্টের কেব্ল যেদিন স্থাপন করা হয়, সেদিন রাতেই তা চুরি হয়ে যায়। গত আগস্ট থেকে বিমানবন্দরে ট্রান্সফরমার, বৈদ্যুতিক তার ও রানওয়ের আলোসংক্রান্ত সরঞ্জাম চুরির অন্তত ১১টি ঘটনা ঘটেছে বলে বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে।
পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গত ২০ অক্টোবর চট্টগ্রামে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর আগমন উপলক্ষে ৬১টি ল্যাম্পপোস্ট সচল করতে ১৯ অক্টোবর সারা দিন ধরে কেব্ল স্থাপনের কাজ করা হয়। কিন্তু সেদিন রাতেই সেগুলো চুরি হয়ে যায়, ফলে প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার আগেই ল্যাম্পপোস্টের কেব্ল হারিয়ে যায়।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ১৯ অক্টোবর রাতে বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকার প্রধান প্রবেশপথ জাপানি গেট থেকে ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি ওমনি-ডিরেকশনাল রেঞ্জ (ভিওআর) নেভিগেশন স্থাপনার দিকে যাওয়ার সড়ক থেকে প্রায় ৫০০ ফুট ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক কেব্ল চুরি হয়। মাটির প্রায় তিন ফুট গভীরে পুঁতে রাখা ওই তারের আনুমানিক মূল্য ২ লাখ টাকা।
ভিওআর বিমানবন্দরের নেভিগেশন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ; এটি থেকে পাঠানো সংকেত উড়োজাহাজকে দিক নির্ণয় এবং উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় পথনির্দেশনায় সহায়তা করে। তবে সর্বশেষ ঘটনায় ভিওআর যন্ত্রপাতি নয়, এর কাছাকাছি সড়কের বাতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের তার চুরি হয়েছে। চুরির স্থানটির কাছেই বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিজিবির হেলিকপ্টার রাখার হ্যাঙ্গার রয়েছে, ফলে এলাকাটির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
চুরির ধারাবাহিক ঘটনার শুরু গত আগস্টে। বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, গত ২১ আগস্ট রানওয়ের ০৫ প্রান্ত থেকে একটি ট্রান্সফরমার এবং প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি কেব্ল কিট চুরি হয়; একই ঘটনায় ভূগর্ভস্থ তার, রানওয়ের বাতি, লাইট বেস ও লুপিং কেব্লও নিয়ে যায় চোরেরা। এরপর গত ২ সেপ্টেম্বর কার্গো গুদামের পশ্চিম সীমানা থেকে রানওয়ের ০৫ প্রান্তের দিকে প্রায় আধা কিলোমিটার নিরাপত্তাবাতির তার চুরি হলে ওই এলাকার প্রায় এক কিলোমিটার অংশ অন্ধকার হয়ে পড়ে। সেই রাতে ভিওআর নেভিগেশন এলাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও চুরি হয় এবং ওই এলাকাতেও আলোর ব্যবস্থা ব্যাহত হয়।
সেপ্টেম্বরজুড়ে চুরি চলতে থাকে রানওয়ের ২৩ প্রান্তে। গত ৮ সেপ্টেম্বর সেখান থেকে অ্যাপ্রোচ লাইটের দুটি ট্রান্সফরমার এবং প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি কেব্ল কিট, ১০ সেপ্টেম্বর আরও তিনটি ট্রান্সফরমার ও সংশ্লিষ্ট তার এবং ১৩ সেপ্টেম্বর ২৩ প্রান্তের বোট ক্লাবের কাছে ছয়টি ট্রান্সফরমার ও বিভিন্ন কেব্ল কিট চুরি হয়। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর একই এলাকা থেকে পাঁচটি ট্রান্সফরমার ও তার, ৬ অক্টোবর আরও পাঁচটি ট্রান্সফরমার ও সংশ্লিষ্ট তার এবং ১০ অক্টোবর রাতে আরও তিনটি ট্রান্সফরমার ও তার চুরির ঘটনা ঘটে।
রানওয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার-ক্যামসে জয়েন্ট ভেঞ্চারের চিঠিতেও চুরির তথ্য উঠে এসেছে। গত ৫ অক্টোবর বিমানবন্দরের প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে তারা জানতে পারে সিম্পল অ্যাপ্রোচ লাইটিং সিস্টেমের (এসএএলএস) সার্কিট-২ কাজ করছে না। পরে পরিদর্শনে এসএএলএস-০৭ অংশ থেকে পাঁচটি সিরিজ ট্রান্সফরমার, কিটসহ ২৫ মিটার সেকেন্ডারি কেব্ল, তিন মিটার খোলা তামার তার এবং ৩০ মিটার বডি-আর্থিং উপকরণ পাওয়া যায়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বিষয়টি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) জানানোর পর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
বারবার চুরির বিষয়ে শাহ আমানত বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা বাদশা মো. ফয়সাল চুরির কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা চোর ধরতে তৎপর রয়েছি। ইতিমধ্যে একজন চোরকে ধরা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।’ তবে এত নিরাপত্তাকর্মী থাকার পরও চুরি থামছে না কেন—এ বিষয়ে মন্তব্য না করে তিনি জনসংযোগ বিভাগে কথা বলতে বলেন। তাঁর দাবি, যেসব এলাকায় চুরি হচ্ছে, সেগুলো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।
এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মেম্বার (সিকিউরিটি) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল বলেন, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় আরও ৬০ জন আনসার সদস্য দেওয়া হবে।


