ইউক্রেনকে সংস্কার দ্রুত করতে বলল ইইউ, সদস্যপদের পথে আরও সতর্ক রোডম্যাপ

ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের আলোচনার জন্য আরও সতর্ক একটি রোডম্যাপ প্রস্তুত করছে ইউরোপীয় কমিশন। পলিটিকোর হাতে আসা একটি নথি অনুযায়ী, এই রোডম্যাপে ২০২৭ সালে অগ্রগতির জন্য সীমিত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সদস্যপদ পাওয়ার কোনো তারিখের প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
ব্রাসেলস দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার যুদ্ধের পর ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে দেশটিকে ইইউর কাছাকাছি আনার চেষ্টা করছে। শেষ পর্যন্ত সদস্যপদ পেলে কিয়েভ ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত হবে এবং রাশিয়ার নতুন আগ্রাসন আরও কঠিন হয়ে উঠবে বলে মনে করা হয়।
নথিতে ব্রাসেলস কিয়েভকে আইনের শাসন সংস্কারের গতি ‘জরুরি ভিত্তিতে ও উল্লেখযোগ্যভাবে’ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী, পৃথক পৃথক নীতি খাতে আলোচনা সাময়িকভাবে শেষ করার আগে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে এই খাতের মূল শর্তগুলো পূরণ করা জরুরি।
নথিটি কমিশনের সম্প্রসারণ প্যাকেজের অংশ, যা বুধবার উপস্থাপন করা হবে। এতে সাতটি নীতি খাত চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে ইউক্রেন আগামী বছর সাময়িকভাবে আলোচনা শেষ করতে পারে। এতে বোঝা যাচ্ছে, জোটে যোগ দিতে ইউক্রেনকে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে এবং যুদ্ধের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন কতটা কঠিন।
নথিতে ইউক্রেন ও মলদোভার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধানও উঠে এসেছে। দুই দেশের সদস্যপদের আবেদন দীর্ঘদিন ধরে সমান্তরালভাবে এগিয়েছে। কিন্তু এখন মলদোভা অনেক দ্রুত অগ্রগতির অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, ফলে দুই দেশের আবেদন কার্যত আলাদা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ব্রাসেলস যেখানে ইউক্রেনের জন্য ২০২৭ সালে সাতটি খাতে অগ্রগতির লক্ষ্য ধরেছে, সেখানে মলদোভা ২০টির বেশি খাতে আলোচনা শেষ করতে পারে বলে নথিতে বলা হয়েছে।
রাশিয়া পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর মাত্র চার দিন পর, ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন ইইউতে যোগদানের আবেদন করে। একই বছরের জুনে ইউক্রেন ও মলদোভা একসঙ্গে প্রার্থীর মর্যাদা পায় এবং ২০২৪ সালের জুনে একই দিনে দুই দেশের সদস্যপদ আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
এরপর থেকে কিয়েভ ইইউর আইনের সঙ্গে নিজের আইনের তুলনামূলক বিস্তারিত পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে এবং কয়েকটি বড় নীতি খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে। অক্টোবরে ইউক্রেন ও মলদোভা দুই দেশই ইইউর অভ্যন্তরীণ বাজার, প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি খাতে আলোচনা শুরু করে।
ইইউতে যোগ দেওয়া মানে শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়। প্রার্থী দেশগুলোকে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা থেকে শুরু করে প্রতিযোগিতার নিয়ম, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পররাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত ৩৫টি আলোচনা খাতে নিজেদের আইন ও প্রতিষ্ঠানকে ইইউর মানের সঙ্গে মেলাতে হয়।
কমিশনের রোডম্যাপে এমন সাতটি খাত চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে ইউক্রেন ২০২৭ সালে সাময়িকভাবে আলোচনা শেষ করতে পারে। বছরের প্রথমার্ধে শিক্ষা ও সংস্কৃতি, আর দ্বিতীয়ার্ধে মেধাস্বত্ব, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নীতি, শিল্পনীতি, গবেষণা, বহিঃসম্পর্ক এবং পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি খাতের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
কমিশন স্বীকার করেছে, এসব পরিবর্তন জটিল এবং এতে ব্যাপক পরামর্শ, সময় ও সম্পদ লাগে। ইউক্রেনকে অগ্রগতিতে সাহায্য করতে ব্রাসেলস ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষকে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে। যুদ্ধ চলায় দেশটির সরকার ও পার্লামেন্টের ওপর অসাধারণ চাপ থাকায় প্রয়োজনীয় আইন পাস ও বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নথিতে ইউক্রেনের যোগদান আলোচনা শেষ হওয়ার কোনো তারিখের প্রতিশ্রুতি সতর্কভাবে এড়িয়ে গেছে কমিশন। আলবেনিয়া ও মলদোভার মতো অন্য অগ্রসর প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও একই সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ব্যতিক্রম মন্টিনিগ্রো — দেশটির ক্ষেত্রে ২০২৭ সালের জুনে যোগদান চুক্তি সইয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। রোডম্যাপটিকে একটি ‘জীবন্ত নথি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, অর্থাৎ সংস্কার প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত এগোলে আরও খাতে আলোচনা শেষ করা যেতে পারে।
এই অনিশ্চয়তার পেছনে যুদ্ধরত একটি দেশকে সদস্য করার বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ইইউর নিয়মে যুদ্ধরত দেশের সদস্য হওয়া স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ নয়, তবে ইউক্রেনের যোগদান নিরাপত্তা, ভূখণ্ড এবং পারস্পরিক সহায়তার বিধান অনুযায়ী সহসদস্যের প্রতি ইইউ দেশগুলোর দায়িত্ব নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তুলবে। শান্তি চুক্তি হলেও এসব প্রশ্নের স্বয়ংক্রিয় সমাধান হবে না এবং সংস্কার শেষ করার প্রয়োজনও দূর হবে না।



