রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ বড়, তবে জনগণের সরকার পরাজিত হবে না: জাহেদ উর রহমান

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা যেকোনো দলের সামনেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একটি ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের ভাষায়, চ্যালেঞ্জ আছে, কিন্তু জনগণের সরকার পরাজিত হবে না।
তিনি লিখেছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও পলায়ন একটা যুদ্ধের বিজয়, কিন্তু বৃহত্তর যুদ্ধটা এতে শেষ হয়ে যায়নি। লড়াই আরও দীর্ঘ—সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র তৈরির পথে যাত্রা শুরু করা। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে অকার্যকর করা হয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় পৌঁছেছিল।
তাঁর মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র শুধু নির্বাচন বা সরকার পরিবর্তনের বিষয় নয়। বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও এখতিয়ারের মধ্য থেকে কাজ করতে হয়। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন সেই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল না। ফলে বর্তমান সরকারকে একই সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সরকারের আট মাসের কার্যক্রম মূল্যায়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অস্বীকার করা যাবে না যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনগণ যতটা অগ্রগতি আশা করেছিল, বাস্তবে তার চেয়ে কম হয়েছে। তবে একই সঙ্গে দেখতে হবে, সরকার কোন পরিস্থিতিতে কাজ শুরু করেছে। সরকারের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, আমলাতন্ত্রের বড় অংশেরই দীর্ঘদিন ধরে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকারের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই।
রাজনৈতিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং সাধারণ নাগরিকেরা সরকারের কঠোর সমালোচনা করতে পারছেন। তাঁর ভাষায়, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই সহনশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি আওয়ামী শাসনামলের লুটপাটের ফল এবং বিশ্ব-পরিস্থিতির কথা বলেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। হাসিনা সরকারের আমলে দেশীয় জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সহায়তার উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের মধ্যে ৪১ লাখ পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতি পরিবারে গড়ে পাঁচজন সদস্য ধরলে প্রায় দুই কোটি মানুষ এর সুবিধা পাবে। পরিবারপ্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ভিজিএফ ও খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরাদ্দ চালের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হয়েছে।
জ্বালানিনিরাপত্তার জন্য নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাস দ্রুত কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে—মানুষ যাতে সহজে বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার করতে পারে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে, সে জন্য প্রণোদনা ও নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগও রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে পরিবর্তনটি স্পষ্ট হবে। তখন গান গাওয়া বন্ধ করা হচ্ছিল, মেয়েদের ফুটবল খেলতে দেওয়া হচ্ছিল না, যাত্রা, মেলা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটেছে। শতাধিক মাজারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। এমনকি দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা অফিসে ঘোষণা দিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল, কিন্তু সরকার ছিল নির্বিকার। তাঁর মূল্যায়ন, বর্তমান বাংলাদেশ সেই পরিস্থিতি থেকে প্রায় পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছে এবং পুলিশ আগের তুলনায় ভালো কাজ করছে।
তবে যে সরকার সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং অর্ধেকের বেশি ভোটারের সমর্থন পেয়েছে, তার কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকবে বলেও তিনি স্বীকার করেন।
দলীয় নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগের প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইতিমধ্যে একজন সংসদ সদস্য ও একজন প্রতিমন্ত্রীকে পদ ছাড়তে হয়েছে। একজনের বিরুদ্ধে দখলদারির অভিযোগ ছিল, অন্যজন প্রকাশ্যে আইন ভঙ্গ করেছিলেন। নাগরিকদের কাছে বার্তা গেছে যে অভিযোগ উঠলে সরকার সেগুলো উপেক্ষা করছে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শেষে তিনি লিখেছেন, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সে ভুল স্বীকার করতে এবং তা সংশোধন করতে প্রস্তুত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন থেকে শুরু করে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক অধিকার—সব ক্ষেত্রেই সেই গণতান্ত্রিক চর্চাকে এগিয়ে নিতে হবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া সরকার এই চ্যালেঞ্জে পরাজিত হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাহেদ উর রহমান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নীতি ও কৌশল, তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতি বিষয়ক দায়িত্বে রয়েছেন।




