খাদ্য বাণিজ্যে ব্রেক্সিটের কড়াকড়ি তুলে নিতে চূড়ান্ত চুক্তিতে যুক্তরাজ্য ও ইইউ
খাদ্য ও প্রাণীজ পণ্যের আমদানি-রপ্তানিতে ব্রেক্সিট-পরবর্তী কড়াকড়ি ও সীমান্ত পরীক্ষা প্রত্যাহারে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সসেজ ও পনির থেকে শুরু করে চামড়াজাত পণ্য ও ফুল পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্যিক পণ্য এই সমঝোতার আওতায় আসছে।
এর পাশাপাশি আগামী ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে বেশ কিছু সম্পূরক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। সেসব চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের একক বিদ্যুৎ বাজারে পুনরায় যুক্ত হওয়ার পথ সুগম হবে ব্রিটেনের।
তবে একক বিদ্যুৎ বাজারে ফেরার শর্ত হিসেবে যুক্তরাজ্যকে আবারও ইইউর কেন্দ্রীয় বাজেটে আর্থিক অনুদান দিতে হবে। যৌথ খসড়ায় বলা হয়েছে, ইইউর অভ্যন্তরীণ বাজারের অংশবিশেষে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে একটি উপযুক্ত আর্থিক অবদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যা বাজারে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণের মাত্রাকে প্রতিফলিত করবে।
এই পদক্ষেপ ব্রিটিশ খাদ্য রপ্তানিকারকদের জন্য বড় ধরনের বাণিজ্যিক স্বস্তি বয়ে আনবে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ক্ষুদ্র খুচরা বিক্রেতারা এখন থেকে কম খরচে সীমিত পরিমাণে বিশেষায়িত পনির ও ওয়াইন আমদানির সুযোগ ফিরে পাবে, যা ২০২২ সালে আরোপিত ব্রেক্সিট সীমান্ত বিধিনিষেধ ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
স্যানিটারি অ্যান্ড ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) সংক্রান্ত এই চুক্তিটি গত মে মাসেই নীতিগতভাবে চূড়ান্ত হয়েছিল। ২০০ পৃষ্ঠার দীর্ঘ আইনি রূপরেখা এখন চূড়ান্ত হয়েছে এবং এ বিষয়ে নতুন করে আর কোনো দরকষাকষি হবে না।
তবে যুক্তরাজ্যে সরকার ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে শীর্ষ সম্মেলন পিছিয়ে যাওয়ায় চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ২০২৮ সালের প্রথম প্রান্তিকের আগে সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। খাদ্যমান সংক্রান্ত ব্রিটিশ আইনকে ইইউর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার বাধ্যবাধকতাকেই বাস্তবায়ন ২০২৮ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত মাসে ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়ন (এনএফইউ) জানিয়েছিল, ব্রেক্সিট কার্যকরের পর থেকে ইইউর বাজারে যুক্তরাজ্যের খাদ্যপণ্য রপ্তানি এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। এর মধ্যে ডিম, মুরগি ও আলু প্রক্রিয়াজাত পণ্য সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ব্রাসেলসে ইইউ রাষ্ট্রদূতদের বৈঠকে উত্থাপিত হতে যাওয়া যৌথ বিবৃতির খসড়ায় বলা হয়েছে, নতুন এসপিএস চুক্তির ফলে ব্রিটেন ও ইইউর মধ্যে সিংহভাগ প্রাণী, প্রাণীজ পণ্য ও উদ্ভিদের অবাধ চলাচল নিশ্চিত হবে এবং বর্তমানে প্রচলিত কঠোর ছাড়পত্র ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়বে না। যুক্তরাজ্য ও ইইউর পরিবেশগত নীতি সমান্তরাল থাকায় ব্রিটিশ পণ্যের ওপর কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) কার্যকর হবে না।
চুক্তিটি ঘিরে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ইউনিয়নপন্থী রাজনীতিতে বিভাজন তৈরি হয়েছে। ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) নেতা গ্যাভিন রবিনসন এই পদক্ষেপকে সরকারের ‘উদ্যোগের অভাব’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেছেন, এটি প্রত্যাশার তুলনায় অপ্রতুল।
অন্যদিকে আলস্টার ইউনিয়নিস্ট পার্টির উইন্ডসর ফ্রেমওয়ার্কবিষয়ক মুখপাত্র স্টিভ আইকেন সমঝোতাকে সতর্কভাবে স্বাগত জানিয়ে বলেন, চুক্তিটি কার্যকর হলে দেশের বাকি অংশ থেকে আসা বেশিরভাগ কৃষিপণ্যের ওপর নজরদারি পুরোপুরি না হলেও উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।
প্রস্তাবিত কাঠামোর অধীনে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বাজারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ‘ইইউর জন্য নয়’ লেখা বাধ্যতামূলক লেবেল লাগানোর বাধ্যবাধকতাও তুলে নেওয়া হচ্ছে, যা ইতিপূর্বে বড় বড় সুপারশপ কর্তৃপক্ষের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
ব্রেক্সিট-পরবর্তী সীমান্ত ছাড়পত্রের জটিলতা কতটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তা তুলে ধরে এর আগে এক পরিবহন নেতা সংসদীয় কমিটির সামনে বলেছিলেন, কাগজপত্রসংক্রান্ত জটিলতা ছিল ‘এক নরকযন্ত্রণা’। শুধু হিমায়িত মাংসের একটি চালানের সঠিক সনদের অভাবে ফ্রান্সে একটি লরিকে টানা ২৭ দিন পর্যন্ত আটকে থাকতে হয়েছিল।



