হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ: এমপি আমির হামজার প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে ইসিতে আবেদন

কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে জামায়াত থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও আলোচিত ইসলামি বক্তা মুফতি আমির হামজার প্রার্থিতা অবৈধ ও তার নির্বাচন বাতিল ঘোষণার দাবি জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে আবেদন করা হয়েছে। নির্বাচনী হলফনামা ও আর্থিক তথ্যে উল্লেখযোগ্য অসংগতি, তথ্য গোপন এবং প্রাথমিকভাবে মিথ্যা বা ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনে এই আবেদন করেছেন কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ছাত্রদল নেতা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন ভবন, আগারগাঁওয়ে জমা দেওয়া আবেদনে ব্যাংক হিসাবের স্থিতি, ওয়াজ মাহফিল ও আদ-দ্বীন হাসপাতাল থেকে আয়, নগদ অর্থ, কৃষি ও আবাসিক সম্পত্তি, স্ত্রীর সম্পদ, গাড়ি, বাড়িভাড়া, পারিবারিক ব্যয় এবং নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আবেদনকারী মো. সিরাজুল ইসলাম কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পশ্চিম আব্দালপুর এলাকার মরহুম আলী হোসেনের ছেলে। তিনি কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্সের সাবেক শিক্ষার্থী এবং ইবি ছাত্রদলের ২০০৯-১০ মেয়াদের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
আবেদনকারীর দাবি, নির্বাচিত প্রার্থী মো. আমির হামজার দাখিল করা নির্বাচনী হলফনামা ও আয়কর রিটার্নের তথ্যের সঙ্গে বিভিন্ন আর্থিক ও সম্পত্তিসংক্রান্ত নথির মিল নেই। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ৩০ জুন তারিখে ব্যাংক হিসাবে কোনো টাকা না থাকার তথ্য আয়কর রিটার্নে দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির কুষ্টিয়া শাখায় তার একটি হিসাবে ওই সময়ে প্রায় ৬৮ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ টাকা ছিল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচনী হলফনামায় ওই ব্যাংকের নাম ও হিসাব নম্বর উল্লেখ না করার বিষয়টিও তথ্য গোপনের অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আয়ের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে আবেদনে। এতে বলা হয়, আমির হামজা প্রতি জুমার নামাজে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এক লাখ টাকা সম্মানী পান বলে তার নিজের স্বীকারোক্তির উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে প্রতিবার তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা সম্মানী পাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, এসব আয় ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব।
কিন্তু নির্বাচনী হলফনামা কিংবা আয়কর রিটার্নে এসব আয়ের কোনো উল্লেখ নেই বলে আবেদনে বলা হয়েছে। আয়কর রিটার্নে তার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে মাত্র ৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা, যার পুরোটাই হামজা এন্টারপ্রাইজের কাপড় ও বইয়ের ব্যবসা থেকে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নগদ অর্থের হিসাবেও বড় ধরনের পার্থক্যের কথা বলা হয়েছে আবেদনে। নির্বাচনী হলফনামায় আমির হামজার হাতে নগদ অর্থ দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১৭০ টাকা। অন্যদিকে আয়কর রিটার্নে নগদ অর্থের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩৮ লাখ ৪৫ হাজার ১৭০ টাকা। দুই নথির হিসাবে পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখ টাকা।
স্ত্রীর সম্পদের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারী। তার দাবি, নির্বাচনী হলফনামায় স্ত্রীর আয়কর রিটার্নের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। স্ত্রী তামান্না সুলতানার কৃষিজমির পরিমাণ ও মূল্য নিয়েও দুই নথিতে বড় পার্থক্য রয়েছে। হলফনামায় কৃষিজমির পরিমাণ ১২ কাঠা বা ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মূল্য দুই লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। কিন্তু স্ত্রীর আয়কর রিটার্নে কৃষিজমির পরিমাণ ১২০ শতাংশ এবং মূল্য ১৭ লাখ টাকা উল্লেখ রয়েছে বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে—জমির পরিমাণে প্রায় ১০০ শতাংশ এবং মূল্যে ১৫ লাখ টাকার পার্থক্য।
এ ছাড়া দলিল নম্বর ৬৪৯৮/২০২৫-এর মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত দলিলে ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ জমি কেনার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে আবেদনে। জমিটির মূল্য ছয় লাখ টাকা, যার মধ্যে স্ত্রীর অংশের মূল্য ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীর অভিযোগ, এই জমির তথ্যও নির্বাচনী হলফনামায় প্রকাশ করা হয়নি।




