বিইআরসির বেঁধে দেওয়া দাম কাগজেই, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়

রান্নার কাজে ব্যবহৃত সিলিন্ডারজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম টানা দুই মাসে দুই দফা বাড়ালেও বাজারে শৃঙ্খলা আসেনি। দাম নির্ধারণকারী সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বেঁধে দেওয়া দাম মানছেন না বিভিন্ন পর্যায়ের বিক্রেতারা। গ্রাহককে বাধ্য হয়ে বিক্রেতাদের চাওয়া দামেই এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
বিইআরসি বলেছে, তিনটি কোম্পানির বেশি দামে সিলিন্ডারজাত এলপি গ্যাস বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কয়েক মাস ধরে, বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর, দেশে সিলিন্ডারজাত এলপি গ্যাসের দাম নিয়ে নৈরাজ্য চলছে। বিইআরসির বেঁধে দেওয়া দাম না মেনে বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। সংকটের অজুহাতে একপর্যায়ে ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৭০০ টাকাও নেওয়া হয়।
সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপের পর দাম কিছুটা কমানো হলেও তা বিইআরসির বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে অনেক বেশি। আমদানির পরিমাণ চাহিদা অনুযায়ী থাকলেও দাম বাড়ানোর জন্য অজুহাত দেখানো হয় সরবরাহসংকটের। কিন্তু এলপি গ্যাস আমদানিকারক ও সিলিন্ডারজাতকারী কোম্পানিগুলো সরবরাহ ঠিক থাকার কথা জানিয়ে মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী করে ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের। রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করে প্রায় এক কোটি মানুষ।
দেড় মাসের বেশি সময় ধরে বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি দরে সিলিন্ডারজাত এলপি গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। দাম নিয়ন্ত্রণে গত অক্টোবর ও নভেম্বরে এলপি গ্যাসের দাম বাড়ায় বিইআরসি। তিন স্তরের ব্যবসায়ীদের কমিশনও বাড়ানো হয়। তবু বাজারে শৃঙ্খলা নেই। ১২ কেজির সিলিন্ডার খুচরায় আগের মতোই ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ চলতি নভেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপি গ্যাসের সরকারনির্ধারিত সর্বোচ্চ মূল্য ২ হাজার ৬০ টাকা।
বাজারে দামের এই ধারার শুরু গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে। তখন ১২ কেজির এলপি গ্যাসের সর্বোচ্চ দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারিত থাকলেও বাজারে বিক্রি হয় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়। পরে অক্টোবরে বিইআরসি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও বিক্রি হয় আগের দামেই; কোথাও কোথাও ২ হাজার ৫০০ টাকায়ও বিক্রির খবর আসে। নভেম্বরে দাম আরও ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সেই দাম মানছেন না ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর খুচরা বিক্রেতা, এলপিজির গ্রাহক ও পরিবেশকদের সঙ্গে বুধবার কথা বলে জানা যায়, বাজারে এখনো এলপি গ্যাসের সরবরাহসংকট রয়ে গেছে বলে তাঁরা মনে করছেন। কোম্পানিগুলো কম সরবরাহ করছে। ফলে সরকার নির্ধারিত দামে অনেক কোম্পানির এলপি গ্যাস পাওয়া যায় না।
ঢাকার বনশ্রীতে রাঁধুনী রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক আজিজুল ইসলাম বুধবার বলেন, ‘সরকার যে দাম নির্ধারণ করে, সেটা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। আমরা আগের মতোই ২ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনছি। দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। আমাদের বাধ্য হয়েই কিনতে হচ্ছে।’
বাড়তি দামের বিষয়ে জানতে চাইলে খুচরা বিক্রেতা মোহাম্মদ মনির বলেন, এলপিজির বিভিন্ন স্তরে এখনো সরবরাহসংকট রয়ে গেছে। আগে ডিলার দোকানে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার দিয়ে যেত; এখন ডিলারদের পেছনে ঘুরেও সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। সরকার খুচরা পর্যায়ে যে দাম নির্ধারণ করেছে, সেই দামে তাঁরা কয়েকটি কোম্পানির গ্যাস পান। কিন্তু তিনটি কোম্পানির সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ২৫০ টাকায়। ফলে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় তাঁদের বিক্রি করতে হচ্ছে।
পরিবেশক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্ল্যান্টেই বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। এলপি গ্যাসের একজন পরিবেশক জানান, বুধবারও কয়েকটি কোম্পানির প্ল্যান্ট থেকে সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে ৯০ থেকে ২৪০ টাকা বেশি দামে ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে। তাঁরা বিষয়টি বিইআরসির কাছে জানিয়েছেন। কমিশন কী ব্যবস্থা নেয়, তার অপেক্ষায় আছেন তাঁরা।
বাজারে এলপিজির সংকটের কথা বলা হলেও আমদানির চিত্র বলছে, চাহিদার তুলনায় বাড়তি এলপি গ্যাস আমদানি হয়েছে। গত আগস্টে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন, সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং অক্টোবরেও প্রায় সমপরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়েছে। দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টন।
বাজারে কৃত্রিম সংকটের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও দায়ীদের চিহ্নিত করা হয়নি। বেশ কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে বিইআরসিতে অভিযোগ জমা পড়লেও সেসব বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেয়নি কমিশন।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, অন্তত তিনটি কোম্পানি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছে বলে প্রমাণ এসেছে। তবে এসব কোম্পানি সরাসরি আমদানি না করে অন্য আমদানিকারকদের কাছ থেকে কিনে বোতলজাত করছে। তাদের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন।




