ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ২০ হাজার ভোটের গণনা থামাতে চেয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন, বাধা দিল সুপ্রিম কোর্ট
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ব্যালট গণনা বন্ধের চেষ্টা করেছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ভোটারদের অ-নাগরিক দাবি করে তাদের ব্যালট আলাদা রেখে গণনার বাইরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতে বাধা দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছেন, সন্দেহভাজন অ-নাগরিক ভোটারদের তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে; প্রমাণ ছাড়া এসব ভোটের গণনা বন্ধ করা যাবে না।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট গ্রহণের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এই সিদ্ধান্ত আসে। বুধবার (৪ নভেম্বর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ক্যালিফোর্নিয়ার প্রায় ২০ হাজার নিবন্ধিত ভোটারের ব্যালট আলাদা করে রাখার দাবি জানিয়েছিল। এসব ভোটারের নাগরিকত্ব যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের ভোট গণনা বন্ধ রাখতে চেয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। শুধু তাই নয়, এসব ভোট গণনা করলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। ট্রাম্প নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখেন, তাদের সবাইকে দীর্ঘ সময়ের জন্য কারাগারে যেতে হবে।
তবে আদালতে সন্দেহভাজন অ-নাগরিক ভোটারদের তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) গত জুলাইয়ে ক্যালিফোর্নিয়াকে জানিয়েছিল, রাজ্যটির ভোটার তালিকায় প্রায় দুই লাখ অ-নাগরিক থাকতে পারেন। কিন্তু অক্টোবরে পাঠানো তালিকায় নাম ছিল প্রায় ২০ হাজার।
লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির কর্মকর্তারা ওই তালিকা থেকে ২০০ জনের তথ্য যাচাই করে দেখেন। এতে দেখা যায়, জন্মস্থান উল্লেখ থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রেই। এ ছাড়া ১১২ জনের ভোটার নিবন্ধন বাতিল অথবা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ছিল। কর্মকর্তাদের মতে, এই পর্যালোচনাতেই তালিকাটির অবিশ্বাসযোগ্যতা স্পষ্ট হয়ে গেছে।
এর আগেও কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া এমন তালিকায় বড় ভুলের নজির রয়েছে। নেভাদা অঙ্গরাজ্যে প্রথমে প্রায় ১৬ হাজার সন্দেহভাজন অ-নাগরিক ভোটারের নাম দিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। পরে হাতে-কলমে যাচাই করে সেই সংখ্যা কমিয়ে আনা হয় ১৮৫-এ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, ওই ১৮৫ জনের সবাই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।
গত ২৮ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোট গণনা বন্ধের আবেদন নাকচ করে দেন একটি জেলা আদালত। বিচারক ডেভিড কার্টার বলেন, নির্বাচন চলার মধ্যে এ ধরনের নির্দেশনা বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। প্রমাণহীন অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বাহী বিভাগ ভোট গণনা বন্ধ করতে চাইলে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরে ট্রাম্প প্রশাসন আপিল করলেও তিন বিচারকের একটি প্যানেল নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তই বহাল রাখে। সবশেষ গত ২ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টও একই অবস্থান নেয়।
এদিকে অ-নাগরিক ভোটার শনাক্তের নামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিযানও চালিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ‘আনলফুল ভোটার ইনিশিয়েটিভ’ কর্মসূচির আওতায় নয়টি অঙ্গরাজ্যে বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব ও ভোট দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন কর্মকর্তারা। বিশেষ করে যারা জন্মসূত্রে নয়, পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তাদেরই লক্ষ্য করা হয়।
তবে গত ২১ অক্টোবর একটি জেলা আদালত নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান স্থগিতের নির্দেশ দেন। আদালত বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস নেই, ফলে এই প্রক্রিয়ায় ভুল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ভারত ও ব্রাজিলের উদাহরণ টেনেছেন ট্রাম্প। গত আগস্টে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নাম উল্লেখ করে দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রশংসাও করেন তিনি। ভারতে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রমে খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। তবে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অ-নাগরিক নন।
অন্যদিকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত ২ নভেম্বর হায়দরাবাদে বিজেপির এক অনুষ্ঠানে দাবি করেন, এসআইআরের মাধ্যমে বাদ পড়া প্রায় তিন কোটি নাম ছিল অনুপ্রবেশকারীদের, যাদের মধ্যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীও রয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। পশ্চিমবঙ্গেও প্রায় ২৭ লাখ নাম যৌক্তিক অসংগতির কারণে বাদ দেওয়া হয়েছিল; তবে পরে বাদ পড়া অনেককে প্রকৃত ভোটার হিসেবে শনাক্ত করা হয় এবং গত ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ১ লাখ ২৬ হাজার আবেদনের ৯৩ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।



