প্যারিস চুক্তির দশ বছর: উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রির লক্ষ্য হাতছাড়া, তবু পূর্বাভাস কমেছে ৩.৬ থেকে ২.৬ ডিগ্রিতে
প্যারিস জলবায়ু চুক্তি কার্যকর হওয়ার দশ বছর পূর্ণ হয়েছে। প্রায় প্রতিটি দেশকে একটি অভিন্ন লক্ষ্যে বেঁধে দেওয়া এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (৩.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) অনেক নিচে রাখা এবং ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (২.৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট) সীমিত রাখার চেষ্টা করা।
চুক্তিটি ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্যারিসে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে (কপ২১) ১৯৬টি পক্ষ গ্রহণ করে এবং ২০১৬ সালের ৪ নভেম্বর তা কার্যকর হয়। বর্তমানে ১৯৩টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ১৯৪টি পক্ষ এই চুক্তিতে রয়েছে।
এক দশকে চুক্তিটি শক্তিশালী জলবায়ু নীতি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছে। তবে নির্গমন এখনো রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি, তাপমাত্রা বাড়ছেই এবং ১.৫ ডিগ্রির সীমা নাগালে রাখতে যে পরিমাণ নির্গমন কমানো দরকার, দেশগুলো তা থেকে এখনো অনেক দূরে।
চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিতে দুবার যোগ দিয়ে দুবারই বেরিয়ে গেছে। দুটি প্রত্যাহারের নির্দেশই দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রথম প্রত্যাহার কার্যকর হয় ২০২০ সালের নভেম্বরে, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার যোগ দেন। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ১২ মাস পর, চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র আবার চুক্তি ছাড়ে।
চুক্তিটি সব দেশের ওপর একই হারে নির্গমন কমানোর বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেয়নি। প্রতিটি সরকার নিজে লক্ষ্য নির্ধারণ করে জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) জমা দেয়, যেখানে নির্গমন কমানো ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর পরিকল্পনা থাকে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নতুন ও আরও উচ্চাভিলাষী এনডিসি জমা দিতে হয় এবং একই চক্রে বৈশ্বিক অগ্রগতির মূল্যায়ন (গ্লোবাল স্টকটেক) হয়। চুক্তিতে প্রতিবেদন, জলবায়ু অর্থায়ন ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহায়তার বিষয়ও রয়েছে।
চুক্তিটি কোনো দেশকে তার লক্ষ্য পূরণে বাধ্য করে না। অগ্রগতি বাড়াতে এটি স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক চাপের ওপর নির্ভর করে।
চুক্তি গৃহীত হওয়ার পর থেকে তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। ২০২৪ সালে পৃথিবী প্রথমবারের মতো একটি পুরো ক্যালেন্ডার বছরজুড়ে প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রির বেশি উষ্ণ ছিল।
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল ছিল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ তিন বছর এবং প্রথম তিন বছরের এমন সময়কাল যেখানে গড় উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের গড় এখন প্রায় ১.৪ ডিগ্রি এবং বিজ্ঞানীরা আশা করছেন এই দশকের শেষ নাগাদ তা ১.৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে।
অক্টোবরে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) জানিয়েছে, উষ্ণায়নকে ১.৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখার সম্ভাবনা, তা অতিক্রম না করে, হারিয়ে গেছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন বলেছেন, ১.৫ ডিগ্রির ওপরে প্রতি ভগ্নাংশ ডিগ্রি ও প্রতি অতিরিক্ত বছর উষ্ণায়ন জলবায়ু প্রভাব ও ঝুঁকি বাড়ায়, যেমন এই বছর অনেক দেশকে ভোগানো প্রাণঘাতী বন্যা, তাপপ্রবাহ ও দাবানল।
তবু পরিস্থিতি ২০১৫ সালের তুলনায় কম খারাপ। প্যারিস চুক্তি সইয়ের সময় বিদ্যমান নীতিতে বিশ্ব ২১০০ সাল নাগাদ প্রায় ৩.৬ ডিগ্রি উষ্ণায়নের পথে ছিল। ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকারের হিসাবে দেশগুলো জলবায়ু নীতি নেওয়া ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বাড়ায় সেই পূর্বাভাস কমে প্রায় ২.৬ ডিগ্রিতে নেমেছে। তবে ২০২১ সালের পর অগ্রগতি থমকে গেছে এবং বর্তমান নীতি এখনো চুক্তির প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণায়নের দিকে ইঙ্গিত করে।
উষ্ণায়নের প্রধান চালক কার্বন ডাই-অক্সাইড মূলত কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানো থেকে আসে, আর বন উজাড়ে তা শোষণকারী গাছ কমে যায়। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত মিলে এখন বিশ্বের বার্ষিক নির্গমনের অর্ধেকের বেশি ঘটায়। চীন একাই যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া ও জাপানের মিলিত নির্গমনের চেয়ে বেশি নির্গমন করে, যদিও ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি কার্বন নির্গমন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ এখন জীবাশ্ম জ্বালানির প্রায় দ্বিগুণ, কিন্তু নির্গমন কমার গতি ১.৫ ডিগ্রি নাগালে রাখার জন্য যথেষ্ট হয়নি। বিশ্বের মোট নির্গমন ২০১৬ সালের তুলনায় ৯ শতাংশ বেড়েছে। চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার নির্গমন বেড়েছে; ইন্দোনেশিয়া কানাডাকে সরিয়ে শীর্ষ দশে উঠেছে। অন্যদিকে জার্মানি, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র মূলত কয়লার বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্যাস ব্যবহার করে নির্গমন কমিয়েছে, তবে অন্যত্র বৃদ্ধি সেই কমতিকে ছাপিয়ে গেছে।




