এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্রে পিছিয়ে বাংলাদেশসহ চার দেশ: ১৩৬ প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি আটকে, বলছে আইইইএফএ
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, তীব্র মুদ্রা অবমূল্যায়ন ও সরঞ্জাম সরবরাহের দীর্ঘসূত্রতায় বাংলাদেশসহ এশিয়ার চার দেশে প্রস্তাবিত এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও টার্মিনালের অর্ধেকের বেশি মুখ থুবড়ে পড়েছে। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে।
‘এলএনজি-টু-পাওয়ার ইন ইমার্জিং এশিয়া: আ ফাইভ-ইয়ার রিভিউ অব প্রজেক্ট আউটকামস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের পর থেকে উচ্চ পরিচালন ব্যয় ও ঋণপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ খাতের সম্প্রসারণ মারাত্মকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনে চার দেশের প্রায় ১৩ হাজার ২০ কোটি ডলারের ১৩৬টি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আমদানি টার্মিনালের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাতে দেখা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৪৯টি বিদ্যুৎ প্রকল্প ও ২২টি আমদানি টার্মিনাল হয় পুরোপুরি বাতিল হয়েছে, নয়তো সেগুলোর বাস্তবায়নে অর্থবহ কোনো অগ্রগতি হয়নি।
অনিশ্চয়তায় আটকে থাকা এসব প্রকল্পের সম্মিলিত আর্থিক মূল্য প্রায় ৬ হাজার ৭৮০ কোটি ডলার, যা গত পাঁচ বছরে সফলভাবে চালু হওয়া প্রকল্পগুলোর মোট আর্থিক মূল্যের চেয়ে প্রায় সাড়ে চার গুণ বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষিত সময়ে প্রস্তাবিত মোট উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ১১ শতাংশ ও টার্মিনাল সক্ষমতার মাত্র ১৫ শতাংশ বাস্তবে রূপ পেয়েছে। সাধারণত তিন থেকে চার বছরে কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে যাওয়ার কথা থাকলেও চালু হওয়া কেন্দ্রগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ তৈরিতে গড়ে সাত বছরের বেশি সময় লেগেছে।
আইইইএফএর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে গ্যাস টারবাইনের সরবরাহ সংকট নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মূলধনি ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারী শিল্পের বিশেষায়িত টারবাইন সংগ্রহের জন্য বর্তমানে ছয় বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ ও ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি বাজার অস্থিরতার মুখে পড়ে; এর ফলে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়ার স্পট মার্কেটে এলএনজির দর প্রতি এমএমবিটিইউ ২৭ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছায়।
এসব প্রতিকূলতায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জীবনকালব্যাপী ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় ২০২১ সালের প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে সর্বোচ্চ ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার ডোলম্যান। তাঁর মতে, সস্তা জ্বালানি ও সাশ্রয়ী ব্যয়ের যে ধারণার ওপর ভিত্তি করে দেশগুলো পরিকল্পনা করেছিল, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় তা অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সংস্থাটির বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম জানান, বিশ্ববাজারে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দর ২০ ডলার স্পর্শ করলেই প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে সরকারকে ৬০ টাকার বেশি ভর্তুকি গুনতে হয়। চলতি বছর আন্তর্জাতিক সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে এর চেয়েও বেশি দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হয়েছে সরকার, যা জাতীয় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের পর বাংলাদেশে তিনটি এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলেও টেকসই সরবরাহের অভাবে গ্যাসসংকট দূর হয়নি, আর জ্বালানি ব্যয়ের কারণে রিজার্ভ সুরক্ষায় বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। সংকট কাটাতে আমদানির পেছনে না ছুটে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বৃহৎ পরিসরে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির সম্প্রসারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্য তিন দেশের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। ফিলিপাইনে ব্যাংকঋণের উপযোগী দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি না হওয়া ও নবায়নযোগ্য শক্তির বিকাশে নতুন আমদানি টার্মিনালের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা নষ্ট হয়েছে। ভিয়েতনামে পাঁচ বছরে কেবল একটি এলএনজিভিত্তিক কেন্দ্র উৎপাদনে আসতে পেরেছে। থাইল্যান্ড অবকাঠামো নির্মাণে কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করলেও চাহিদার অভাবে বিদ্যমান কেন্দ্র ও টার্মিনালের বড় অংশ অলস বসে রয়েছে।
গবেষণা প্রধান স্যাম রেনল্ডসের মতে, জ্বালানি ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অনিশ্চয়তা এ অঞ্চলের দেশগুলোতে প্রকল্পের নিশ্চিত আয়ের সুযোগ সংকুচিত করে দিয়েছে; ফলে আন্তর্জাতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রত্যাশার তুলনায় উদীয়মান এশিয়ায় এলএনজির সম্প্রসারণ অত্যন্ত মন্থর হয়ে পড়েছে।

