বনফায়ার নাইট ঘিরে যুক্তরাজ্যজুড়ে বড় পুলিশি প্রস্তুতি, দমকলকর্মীদের ওপর হামলা ঠেকাতে সতর্কতা

৫ নভেম্বরের বনফায়ার নাইটকে ঘিরে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও দমকল বাহিনী আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে। আতশবাজি-সহিংসতার পুরোনো অভিজ্ঞতা থাকা লিডস ও এডিনবরাসহ কয়েকটি এলাকায় এবারও উত্তেজনার আশঙ্কা করা হচ্ছে, আর দমকলকর্মীদের ইউনিয়ন সতর্ক করেছে, পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম ছাড়া এই রাত সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
উৎসবের আগের কয়েক দিনেই কিছু এলাকায় অশান্তি ও অসামাজিক আচরণের ঘটনা ঘটেছে। জনসমাগমস্থলে আতশবাজি ছোড়া ঠেকাতে কয়েকটি শহরের পুলিশ ছত্রভঙ্গ করার বিশেষ ক্ষমতাসহ বাড়তি ব্যবস্থা প্রয়োগ করেছে।
শনিবার হ্যালোইনের রাতে বার্মিংহাম শহরের কেন্দ্রে আতশবাজি ছোড়ার ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্যালফোর্ডের একটি পাবের মালিক জানিয়েছেন, প্রায় ৬০ জন কিশোর পাবটি ঘিরে ফেলে ভবন লক্ষ্য করে আতশবাজি ছোড়ে এবং পথচারীদের হয়রানি করে।
স্কটল্যান্ডে এবার বড় ধরনের পুলিশি অভিযান চলছে, যা গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের পর সবচেয়ে বড় বলে জানানো হয়েছে। পারস্পরিক সহায়তা চুক্তির আওতায় ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের পুলিশ বাহিনী থেকে গণশৃঙ্খলা রক্ষার যান ও চালক আনা হচ্ছে। একই রাতে গ্লাসগোতে ইউরোপা লিগের ম্যাচে তুর্কি ক্লাব বেসিকতাসের মুখোমুখি হবে সেল্টিক।
এডিনবরা ও গ্লাসগোর কিছু এলাকায় আতশবাজি নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল চালু করা হয়েছে, যেখানে বিস্ফোরক জাতীয় আতশবাজি ব্যবহার নিষিদ্ধ। ২০২৩ সালের বনফায়ার নাইটে কয়েক ডজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হওয়ার মতো পরিস্থিতি এড়াতেই এই কড়াকড়ি বলে জানানো হয়েছে।
ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারেও বাড়তি পুলিশ মোতায়েন থাকবে। পুলিশ জানিয়েছে, ৫ নভেম্বরের আশপাশের সময়টা বছরের ব্যস্ততম সময়গুলোর একটি। লিডসের হাইড পার্ক এলাকায় আতশবাজিকে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো ব্যবহারের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে নিয়মিত দাঙ্গা পুলিশ ও হেলিকপ্টার ডাকতে হয়। হ্যালোইন ও বনফায়ার পর্বের আগে ব্র্যাডফোর্ড ও হ্যালিফ্যাক্স থেকে ৩০ টন অবৈধ আতশবাজি জব্দ করেছে পুলিশ।
ন্যাশনাল পুলিশ চিফস কাউন্সিলের (এনপিসিসি) একজন মুখপাত্র বলেছেন, বছরের এই সময়ে কেউ কেউ হয়রানি ও অসামাজিক আচরণের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় বেশি অসহায় বোধ করতে পারেন। তিনি বলেন, মানুষ উৎসব উপভোগ করুক—এটাই চাওয়া, তবে কেউ যেন সীমা অতিক্রম না করে এবং আশপাশের অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ওপর এর প্রভাবের কথা মাথায় রাখে।
গত বছর লিভারপুলে একটি ফ্ল্যাটবাড়ির আগুন নেভাতে গিয়ে দমকলকর্মীরা আতশবাজি হামলার শিকার হয়েছিলেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে শেষ হওয়া বছরে ইংল্যান্ডে হামলায় আহত হন ১২৯ জন দমকলকর্মী, আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৯৬; আহতদের মধ্যে ১৩ জনের আঘাত গুরুতর। স্কটল্যান্ডের দমকল ও উদ্ধার সেবার হিসাবে ২০২৫-২৬ সালে কর্মীদের ওপর ১৬টি শারীরিক হামলা এবং সরঞ্জাম ও সম্পত্তির ওপর ২০টি হামলা হয়েছে।
ন্যাশনাল ফায়ার চিফস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ফিল গ্যারিগান বলেছেন, দমকলকর্মীরা অন্যদের রক্ষায় নিজেদের ঝুঁকিতে ফেলেন, তাঁদের কখনোই সহিংসতা বা গালাগালির মুখে পড়া উচিত নয়। তাঁর ভাষায়, দমকলকর্মীরাও কারও মা-বাবা, সন্তান, ভাইবোন ও প্রতিবেশী; তাঁদের ওপর প্রতিটি হামলা অগ্রহণযোগ্য এবং এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁদের কার্যকরভাবে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাও।
ফায়ার ব্রিগেডস ইউনিয়ন (এফবিইউ) জানিয়েছে, গত বনফায়ার নাইটে হাজার হাজার কলে সাড়া দিতে গিয়ে বাহিনী নিরাপদ সীমার অনেক বাইরে চাপে পড়েছিল; লন্ডনে কলের সংখ্যা ছিল ১০ বছরের সর্বোচ্চ। ইউনিয়নের জাতীয় কর্মকর্তা অ্যাডাম টেলর বলেন, ২০১০ সালের পর থেকে দমকল সেবা ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে; নিরাপদ ও দ্রুত সাড়া নিশ্চিত করতে আরও ৫ হাজার দমকলকর্মী নিয়োগের দাবি জানান তিনি। তাঁর মতে, ফায়ার স্টেশন বন্ধ ও শত শত ইঞ্জিন সেবা থেকে সরিয়ে নেওয়ায় সাড়া দেওয়ার সময় বাড়বে।
আতশবাজি নিয়ন্ত্রণের দাবিও জোরালো হচ্ছে। প্রাণীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে আতশবাজি নিয়ন্ত্রণের দাবিতে Change.org-এ ১৬ লাখের বেশি মানুষ আবেদনে সই করেছেন। স্কটিশ গ্রিনস বুধবার ব্যক্তিগত পর্যায়ে আতশবাজি বিক্রি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে বলেছে, এতে বিপজ্জনক ও অসংগঠিত প্রদর্শনী বন্ধ হবে। ২০২৪ সালে বনফায়ার নাইটের আতশবাজির আতঙ্কে এডিনবরা চিড়িয়াখানার বিপন্ন শিশু লাল পান্ডা রক্সি মারা গিয়েছিল বলে জানিয়েছে রয়্যাল জুলজিক্যাল সোসাইটি অব স্কটল্যান্ড। ন্যাশনাল শিপ অ্যাসোসিয়েশনও সতর্ক করেছে, আতশবাজির ঝলক ও শব্দে গর্ভবতী ভেড়ার গর্ভপাত হতে পারে এবং পশু আতঙ্কে ছুটে পালাতে পারে।



