মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন ইউরোপের কট্টর ডানপন্থীরা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিবিদরা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছেন। তবে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরাসরি ট্রাম্পের সমালোচনা করা থেকে বিরত থেকেছেন।
এই অবস্থান পরিবর্তনটি উল্লেখযোগ্য, কারণ এর আগে ট্রাম্পের জয়ের পর তাদের অনেকেই তার সঙ্গে নিজেদের আদর্শগত সম্পর্কের বিষয়টি ফলাও করে প্রচার করেছিলেন। এমনকি তাদের কেউ কেউ ওয়াশিংটন ডিসি সফরও করেছিলেন।
ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা জর্ডান বারদেলাকে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি আদর্শ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকাংশ জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তার দল পরবর্তী সরকার গঠন করতে পারে।
বারদেলা বলেন, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় তার দ্বিতীয় মেয়াদে বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব কিছুটা কম ছিল। ইরানের বিষয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর অত্যন্ত গুরুতর প্রভাব ফেলে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে এই হস্তক্ষেপের পেছনে ট্রাম্পের ভূমিকা রয়েছে কি না, তা তিনি সরাসরি উল্লেখ করেননি।
জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির সহ-নেত্রী অ্যালিস ভাইডেলও এই পরাজয়ের কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি সংবাদমাধ্যম টি-অনলাইনকে বলেন, ট্রাম্প তার ভোটারদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি হস্তক্ষেপমূলক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবেন না; এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার খেসারত এখন রিপাবলিকানদের দিতে হচ্ছে।
ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ তার দলের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে। তবে তিনি তার সিদ্ধান্তের পক্ষে অটল থাকার কথা জানিয়েছেন।
ইতালিতে ক্ষমতাসীন জোটের অংশ উগ্র-ডানপন্থী লিগ দলের নেতা মাত্তেও সালভিনি বলেছেন, আমেরিকার নির্বাচনের ফলাফলের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক উত্তেজনা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পরিবারগুলোর ওপর। তিনি আরও বলেন, আশা করা যায় এই ভোট সংঘাতের অবসান ত্বরান্বিত করবে এবং শান্তির পথে ফিরে আসার পথ প্রশস্ত করবে।
ইতালির সাবেক জেনারেল রবার্তো ভান্নাচ্চি উগ্র-ডানপন্থী ফুতুরো নাজিওনালে দলের নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ফলাফল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হওয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে এসেছে। ভান্নাচ্চি অতীতে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রশংসা করেছিলেন, তবে পরবর্তী সময়ে তিনি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করেছেন।
ভান্নাচ্চি বলেন, ট্রাম্প প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন; তিনি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারেননি, বরং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন। এর ফলে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অর্থনীতি ও শেয়ার বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
রাজনৈতিক ঝুঁকি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিশ্লেষক মুজতবা রহমানের মতে, ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী নেতারা সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সুবিধার খাতিরেই ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান অজনপ্রিয়তা, বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে, এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যেখানে একসময়ের এই রাজনৈতিক সম্পদটি এখন নির্বাচনী বোঝা হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে রয়েছে।
রহমান জানান, কট্টর ডানপন্থী নেতারা যেন উভয় সুবিধাই পেতে চাইছেন: একদিকে তারা ট্রাম্পবাদের আদর্শিক গতিধারা থেকে ফায়দা নিতে চান, অন্যদিকে ট্রাম্পের শাসনামলের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার দায়ভার থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে চান। তিনি বলেন, ঝুঁকিটি হলো ট্রাম্প এবং তার মাগা মিত্ররা, যারা ইউরোপের কট্টর ডানপন্থীদের ইউরোপীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আদর্শিক সহযোগী হিসেবে দেখেন, তারা এর প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের রাজনৈতিক সমর্থন প্রত্যাহার করে নিতে পারেন, এমনকি উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিতে পারেন।



