বিদ্যালয়ে বুলিং ও সাইবার হয়রানি রুখতে ২০ জেলার ৩০ স্কুলে সচেতনতা কর্মসূচি, ৮ নভেম্বর শিক্ষকদের সঙ্গে অনলাইন মতবিনিময়
বিদ্যালয়ে সহিংসতা, বুলিং ও সাইবার হয়রানি প্রতিরোধে দেশের ২০ জেলার ২৭টি উপজেলার ৩০টি বিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক বিদ্যালয় সহিংসতা ও বুলিং প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ বছরের দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল—‘প্রতিটি শিক্ষার্থী নিরাপদ ও ভালো থাকুক: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন’।
কর্মসূচিতে বিদ্যালয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বুলিং, সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি অনলাইনে নিরাপদ থাকা, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং হয়রানির শিকার শিক্ষার্থীদের সহায়তায় করণীয় তুলে ধরা হয়।
ইউনেস্কোর ঢাকা কার্যালয়ের সহযোগিতায় স্বাস্থ্যবান্ধব বিদ্যালয় (হেলথ প্রমোটিং স্কুল—এইচপিএস) কর্মসূচির আওতায় এসব আয়োজন করা হয়। এতে সহযোগিতা করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম)।
কর্মসূচিতে নায়েমের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. ওয়াসিম মো. মেজবাহুল হক বলেন, সুস্থ ও সচেতন প্রজন্ম গড়ে তুলতে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যবান্ধব বিদ্যালয় কর্মসূচির আওতায় শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসক ও ব্যবস্থাপকদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতাবিষয়ক শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, রেফারেল ব্যবস্থা এবং মনোসামাজিক প্রাথমিক সহায়তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব ঘটনা বন্ধে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ইউনেস্কোর ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান ও বাংলাদেশে সংস্থাটির প্রতিনিধি ড. সুসান ভাইজ বলেন, বিদ্যালয়ে, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে এবং অনলাইনে প্রতিটি শিশুর নিরাপদ থাকার অধিকার রয়েছে। বুলিং প্রতিরোধে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও যত্নশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকার কেরানীগঞ্জের আগানগর উচ্চবিদ্যালয়ে আয়োজিত কর্মসূচিতে ছাত্রীদের প্রতি হয়রানি এবং শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সন্তানদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হুসনা আরা বেগম বলেন, শিক্ষার্থীদের হয়রানি প্রতিরোধ এবং বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ দায়িত্ব শুধু শিক্ষকদের নয়; শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ ও সমাজের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা ও নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করা হয়। অনলাইনে অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, কাউকে অপমান বা হয়রানি না করা এবং বুলিংয়ের শিকার সহপাঠীর পাশে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে বিশ্বস্ত শিক্ষক বা অভিভাবককে জানানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আয়োজকেরা জানান, বিদ্যালয় পর্যায়ের কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় আগামী ৮ নভেম্বর শিক্ষকদের সঙ্গে অনলাইনে মতবিনিময় সভা করবে ইউনেস্কোর ঢাকা কার্যালয়। সভায় বিদ্যালয়ে সহিংসতা, হয়রানি ও সাইবার বুলিং মোকাবিলায় শিক্ষকেরা তাদের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করবেন। এসব আলোচনার ভিত্তিতে বিদ্যালয় পর্যায়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে, যেখানে নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করার করণীয়, দায়িত্ব বণ্টন এবং বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হবে।
উল্লেখ্য, ইউনেস্কোর স্বাস্থ্যবান্ধব বিদ্যালয় (এইচপিএস) কর্মসূচি একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ। বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমে স্বাস্থ্য ও সুস্থতার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য। এর মাধ্যমে শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালকদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থী, পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।


