কানাডার বাজেটে সার্বভৌমত্বে জোর কার্নির, গৃহহীনতা মোকাবিলায় ১ হাজার ১২০ কোটি ডলার

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তাঁর মেয়াদের দ্বিতীয় ফেডারেল বাজেট উন্মোচন করেছেন বৃহস্পতিবার। তেলের রাজস্বে অপ্রত্যাশিত বাড়তি আয়ের সুযোগ নিয়ে এই বাজেটে কয়েক হাজার কোটি ডলারের নতুন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করেছেন তিনি; বাজেটের কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় সার্বভৌমত্ব জোরদার করা এবং জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় মোকাবিলা।
বাজেটটির শিরোনাম ‘মাস্টার্স অব আওয়ার ডেসটিনি’। কার্নি বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘এই বাজেট ঠিক এটাই করে: এটি আমাদের দেশকে আরও স্বাধীন, আরও সার্বভৌম করার কর্মপরিকল্পনার পরবর্তী বড় পদক্ষেপ।’ তিনি বলেছেন, বাজেটের মনোযোগ প্রবৃদ্ধি, মানুষ এবং সেই সার্বভৌমত্বের দিকে — যাতে কানাডীয়রা নিজেদের ইচ্ছেমতো জীবনযাপন করতে পারে।
আগামী পাঁচ বছরে নতুন ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ২০০ কোটি কানাডীয় ডলার; ইরান যুদ্ধের কারণে বেড়ে যাওয়া তেলের দামে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি রাজস্ব আয় থেকেই এই অর্থের জোগান আসছে। কানাডার ঘাটতি ৫ হাজার কোটি কানাডীয় ডলারের বেশি (৩ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার) এবং বাজেটে ভারসাম্যে ফেরার কোনো পথ দেখানো হয়নি; তবে আগের আর্থিক লক্ষ্যগুলো অপরিবর্তিত রেখেছেন কার্নি।
বাজেট অনুযায়ী, আগামী বছর কানাডার জিডিপি মাঝারি হারে বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে — যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া সব জি-সেভেন দেশকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বেকারত্বের হার মাসে মাসে ওঠানামা করলেও সামগ্রিকভাবে গত বছরের তুলনায় কম রয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতি ও সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়া আবাসন ব্যয়ে মানুষ চাপে থাকায়, তাঁর বড় বিনিয়োগগুলোকে সাধারণ কানাডীয়দের জন্য স্বস্তিতে রূপ দেওয়ার চাপ বাড়ছে কার্নির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো গভীর ক্ষতির মুখে পড়েছে; এতে হাজার হাজার চাকরি গেছে এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ধীর হয়ে পড়েছে।
কার্নির দ্বিতীয় বাজেটের সবচেয়ে বড় খাতগুলোর একটি হলো গৃহহীনতা মোকাবিলা — আগামী চার বছরে এ খাতে ১ হাজার ১২০ কোটি কানাডীয় ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সহায়ক আবাসন, মানসিক স্বাস্থ্য ও আসক্তি চিকিৎসার অর্থায়ন। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা গত বছর জানিয়েছিল, প্রতি আটটি কানাডীয় পরিবারের একটি তাদের জীবনে কোনো না কোনো রূপের গৃহহীনতার অভিজ্ঞতা পেয়েছে।
সরকার নিম্ন ও মাঝারি আয়ের কানাডীয়দের জন্য মুদি সুবিধাও বাড়াবে; হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের মধ্যে চার সদস্যের একটি পরিবার এতে ২ হাজার ৫৭০ কানাডীয় ডলার পর্যন্ত পেতে পারে।
বিরোধী কনজারভেটিভরা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে লিবারেল সরকারের ওপর চাপ দিয়ে আসছে এবং নিয়মিত অভিযোগ করছে, প্রধানমন্ত্রী ঘরোয়া বিষয়ের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ না দিয়ে বিদেশে বাণিজ্য সফরে বেশি সময় কাটাচ্ছেন। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি এবং ফুড ব্যাংক ব্যবহার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডায় বাড়ির গড় দাম প্রায় ২২ শতাংশ কমেছে — মূলত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের কারণে — তবে টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভারের মতো বড় শহরগুলোতে বাড়ি এখনো অনেকের সাধ্যের বাইরে।
২০২৩ সালে রেকর্ড জনসংখ্যা বৃদ্ধির পর — যার বড় কারণ ছিল অভিবাসন — কানাডা নতুন আগমনকারীদের লক্ষ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে; আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী বিদেশি কর্মীদের ওপর সীমা আরোপ করা হয়েছে। কার্নি সরকার আগেই বলেছে, ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের লক্ষ্য ৩ লাখ ৮০ হাজার রাখা হবে, আর অস্থায়ী বাসিন্দাদের আগমন ধাপে ধাপে ৩ লাখ ৭০ হাজারে নামিয়ে আনা হবে। নতুন বাজেটে অভিবাসনের মাত্রা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কার্নি। রয়্যাল ব্যাংক অব কানাডার সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল, অভিবাসন ছাড়া শতাব্দীর শেষ নাগাদ দেশের জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসবে; অন্যদিকে কনজারভেটিভ বিরোধীরা লক্ষ্য আরও কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।
বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কানাডার নির্ভরতা কমানো কার্নি সরকারের বড় মনোযোগের বিষয়। গত বছর নতুন রফতানি বাজার গড়ে তুলতে কাজ করা ব্যবসাগুলোর জন্য কোটি কোটি ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল এবং শুল্কের চাপ এড়াতে ব্যবসাগুলো যাতে যুক্তরাষ্ট্রে চলে না যায়, সে জন্য কানাডার প্রান্তিক কার্যকর করহার কমানো হয়েছিল। এই বাজেটে ইস্পাত ও বনশিল্পের মতো মার্কিন শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত নির্দিষ্ট খাতগুলোকে সহায়তার পরিকল্পনা রয়েছে। বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে মার্কিন শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও ব্যবসার জন্য প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কোটি কানাডীয় ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে; বাজেটের ভাষায়, বৈচিত্র্যায়নে সময় লাগবে, তবে পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে।
সার্বভৌমত্ব এই বাজেটের বড় থিম — শিল্প থেকে মহাকাশ পর্যন্ত কানাডীয় পরিচয় শক্তিশালী করার নানা পদক্ষেপে অর্থায়নের প্রস্তাব রয়েছে। কানাডাই একমাত্র জি-সেভেন দেশ, যার নিজস্ব রকেট উৎক্ষেপণের সক্ষমতা নেই; সেই চিত্র বদলাতে কানাডীয় মহাকাশ প্রযুক্তি ও উৎক্ষেপণ অবকাঠামো উন্নয়নে ২৭০ কোটি কানাডীয় ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিল্প-সংস্কৃতিতে মৌলিক ও সৃজনশীল শিল্পকর্ম থেকে আয়ের ওপর কর ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কার্নি। এ ছাড়া কানাডীয়দের জন্য বিনামূল্যের জাতীয় ডিজিটাল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় চার বছরে ৩ কোটি ২২ লাখ কানাডীয় ডলার রাখা হয়েছে; শুরুতে এতে অন্তত ২০০টি বই থাকবে।
প্রতিরক্ষা খাতে কার্নি আগেই ২০৩৫ সালের মধ্যে বার্ষিক জিডিপির ৫ শতাংশের ন্যাটো লক্ষ্য পূরণে প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এই বাজেটে সেই অর্থের একটি দিকনির্দেশনা মিলেছে: চলতি বছরের শুরুতে চালু হওয়া কানাডীয় তৈরি ড্রোন বিক্রির মার্কেটপ্লেস আগামী পাঁচ বছরে ২৩০ কোটি কানাডীয় ডলার পাবে। পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার আগ্রাসন প্রতিহত করতে কানাডার সবচেয়ে বড় বিদেশি মোতায়েন মিশন ‘অপারেশন রিঅ্যাসুরেন্স’-এর জন্যও বাড়তি অর্থায়ন যাবে।




