ফুসফুসের ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের তিন সপ্তাহ পর লাতিন আমেরিকা সফরে পোপ লিও

পোপ লিও চতুর্দশ ফুসফুসের ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের মাত্র তিন সপ্তাহ পর লাতিন আমেরিকার দীর্ঘ সফর শুরু করেছেন। সফরে রয়েছে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও পেরু — যার শেষ দেশটিতে তিনি বহু বছর যাজক হিসেবে কাজ করেছেন, ফলে পেরু সফরটিকে তাঁর জন্য এক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভ্যাটিকান বলছে, পোপের স্বাস্থ্যের বিষয়ে কোনো অসাধারণ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাঁদের ভাষায়, তিনি একজন ৭১ বছর বয়সী মানুষ, যাঁর একটি অস্ত্রোপচার হয়েছে — তিনি কোনো স্থায়ী চিকিৎসা-অবস্থার রোগী নন।
পোপ নিজেই গত মাসে জানিয়েছিলেন, নিয়মিত স্ক্যানে চিকিৎসকেরা একটি টিউমার শনাক্ত করেন। সেই টিউমারসহ তাঁর ডান ফুসফুসের নিচের অংশ কেটে ফেলা হয় এবং তাঁর চিকিৎসক দল পরে নিশ্চিত করে, ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েনি।
সফরের আগে রোমে এক ব্রিফিংয়ে এক মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেন, পোপ লিওর শারীরিক সহনশক্তি অসাধারণ এবং সময়সূচি নিয়ে তিনি অত্যন্ত উৎসাহী। সময়সূচিটি তিনি নিজে কোনো পরিবর্তন ছাড়া নিশ্চিত করেছেন।
ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাসিমো ফাজ্জোলি বলেন, এই সফরের মাধ্যমে ভ্যাটিকানের বার্তা হলো — সেটি ছিল একটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায় এবং এখন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরা গেছে। অস্ত্রোপচারের পর থেকে পোপ ব্যস্তভাবে কাজে ফিরেছেন; গত কয়েক দিনে তাঁকে বক্তৃতা দিতে ও সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে দেখা গেছে।
তবে ১২ দিনের এই সফর যে কারও জন্যই পরিশ্রমের। এতে রয়েছে একাধিক দীর্ঘ ও স্থানীয় ফ্লাইট এবং আমাজন থেকে আন্দেস পর্যন্ত হাজার হাজার মাইল পথ।
সফর শুরু হচ্ছে উরুগুয়ে দিয়ে, যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যাথলিকদের সংখ্যা তীব্রভাবে কমে গেছে এবং দেশটি চার দশকের মধ্যে প্রথম পোপ সফর পেতে যাচ্ছে।
এরপর পোপ যাবেন আর্জেন্টিনায়, তাঁর পূর্বসূরি পোপ ফ্রান্সিসের জন্মভূমিতে। রোমে আর্জেন্টিনার জাতীয় গির্জা সান্তা মারিয়া আদ্দোলোরাতার রেক্টর ফাদার ফের্নান্দো লাগুনা বলেন, এই সফর ফ্রান্সিসের প্রতি এক শ্রদ্ধাও, যিনি পোপ থাকাকালে আর্জেন্টিনায় যেতে পারেননি। পোপ লিওর সফরের ঘোষণায় তাঁদের হৃদয় আনন্দে ভরে গেছে বলে তিনি জানান এবং বলেন, অসুস্থতা সত্ত্বেও পোপ যাবেন বলেই তিনি সবসময় মনে করতেন।
আর্জেন্টিনা অংশটি রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সংবেদনশীল হতে পারে, কারণ সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুষ্ঠানও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই একসময় দরিদ্রদের সাহায্যে সামাজিক ন্যায়ের মতবাদ প্রচারের জন্য পোপ ফ্রান্সিসকে ‘পৃথিবীতে অশুভ’ ও ‘কমিউনিস্ট’ বলেছিলেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার বিশপেরা মিলেইর কঠোর ব্যয়-সংকোচন পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তবে মিলেই ইতিমধ্যে এক্সে এক পোস্টে পোপ লিওকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছেন, আর্জেন্টিনা অপরিসীম আনন্দে অপেক্ষা করছে। তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে লাখো মানুষের সমাগম প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সফরের প্রধান আকর্ষণ রাখা হয়েছে শেষের জন্য — পেরু, যাকে ভ্যাটিকান পোপের শিকড়ে ফেরা বলে বর্ণনা করেছে। এক মুখপাত্রের ভাষায়, তিনি এই রাস্তাগুলো চেনেন।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া তৎকালীন রবার্ট প্রিভোস্ট মাঝে মাঝে বিরতিসহ প্রায় ২০ বছর পেরুতে কাটিয়েছেন এবং তাঁর পেরুর নাগরিকত্বও রয়েছে। সেই সময়টিকে তাঁর পোপ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য মৌলিক বলে মনে করা হয়।
তাঁর সময়সূচিতে রয়েছে চিক্লাইও ডায়োসিসে ফেরা, যেখানে তিনি ২০১৪ সালে বিশপ হিসেবে অভিষিক্ত হন এবং প্রায় এক দশক পর ফ্রান্সিস তাঁকে ভ্যাটিকানে নেওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। তিনি ইনকা সাম্রাজ্যের সাবেক রাজধানী কুসকোতেও যাবেন, যেখানে তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩ হাজারের বেশি মিটার উঁচুতে প্রার্থনা সভা করবেন, এরপর যাবেন আমাজনের পুকাইপায়।
তিনটি দেশেই পোপ যাজকদের যৌন নির্যাতন থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে ভ্যাটিকান জানিয়েছে — যে বিষয়টি তাঁর পূর্বসূরির ২০১৮ সালে চিলি ও পেরু সফরকে মেঘে ঢেকে দিয়েছিল।
অধ্যাপক ফাজ্জোলির মতে, এই সফরের মাধ্যমেই পোপ পদটি ফ্রান্সিসের পর লাতিন আমেরিকার সঙ্গে আবার যুক্ত হচ্ছে, কারণ অঞ্চলটিতে ফ্রান্সিসের সফরগুলো সবসময় মসৃণ ছিল না। তাঁর বিশ্বাস, পোপ লিও আমেরিকা মহাদেশগুলোকে একটি মহাদেশ হিসেবে ঐক্যের শক্তিশালী ধারণা রাখেন। অঞ্চলটির গণতন্ত্রগুলো সংকটে রয়েছে, ফলে তিনি অনেক বিষয়েই কথা বলতে পারেন। এরপর বড় প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্র — প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্বে থাকাকালেই কি তিনি সেখানে সফর করবেন, তা নিয়ে চিন্তা চলছে বলেই ফাজ্জোলি মনে করেন।




