আশাশুনির তামান্নাদের লড়াই: শিশুদের চাপেই ভাসমান সেতু, নিরাপদ পথ পেল ১৪০ শিক্ষার্থী

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের হাওলাদার পাড়ার কিশোরী তামান্না সুলতানা। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে থাকা এই উপকূলীয় ইউনিয়নের ২৩টি গ্রামের মানুষ একে একে এলাকা ছেড়ে যাচ্ছে, আর সেই চলে যাওয়াকেই শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে তুলে ধরেছে তামান্না। তার মতে, বড়রা চলে গেলে শিশুরা অরক্ষিত হয়ে যায়।
খুলনায় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের শিশুরা একসঙ্গে বসেছিল আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনায়। তুরস্কের আনাতোলিয়ায় অনুষ্ঠেয় জলবায়ু সম্মেলনে খুলনার শিশুদের প্রতিনিধিরাও যাবে। সেই আলোচনাতেই তামান্নারা তুলে ধরে, জলবায়ু পরিবর্তন তাদের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে এবং স্থানীয়ভাবে তারা কী উদ্যোগ নিয়েছে।
তামান্না হাওলাদার পাড়ার ‘বাবুই পাখি’ কমিউনিটি শিশু দলের প্রধান। পাড়া ও গ্রামভিত্তিক এমন শিশু-কিশোর দল গড়ে তুলেছে তারা নিজেরাই।
তামান্না পড়ে প্রতাপনগর এলাকার মাধ্যমিক বিদ্যালয় ইউনাইটেড একাডেমিতে। স্কুলটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৬২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ২৬ জন। অথচ ২০২৩ সালে কেউই ফেল করেনি, আর ২০২৫ সালে ফেল করেছিল ১৫ জন।
২০২১–২০২২ সালে প্রতাপনগরে প্রায় ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে যায়। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের সংখ্যা বেশি। ছেলেরা কার্তিক মাসে ইটভাটায় কাজ করতে চলে যায়; কাজ শেষ করে বৈশাখ মাসে ফিরে এলেও স্কুল আর তাদের নেয় না, ফলে বার্ষিক পরীক্ষাও দেওয়া হয় না।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৪ সালের ‘বাংলাদেশের ইটভাটায় শিশুশ্রমের স্বাস্থ্যঝুঁকি’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ইটভাটায় কাজে যোগ দেওয়ার আগে শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং গ্রামের প্রায় ৮৪ শতাংশ শিশু নিয়মিত স্কুলে যেত। সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ইটভাটার মৌসুমে রিজার্ভ বাস যায় কমপক্ষে ১০টি জেলায়, আর ইটভাটার মালিকের দালালেরা পরিবারগুলোকে অগ্রিম টাকা দিয়ে শিশুদের কাজে নিয়ে যায়।
কিশোরীদের ভাষ্যে, বাবা-চাচারা কাজের খোঁজে দূরে চলে গেলে মেয়েশিশুদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়, আর এই বাল্যবিবাহই তাদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার প্রধান কারণ। বিয়ের পর কেউ স্কুলে ফিরতে চাইলেও স্কুলগুলো তাদের আর নেয় না, যদিও বিবাহিত ছেলেদের পড়তে কোনো বাধা নেই।
প্রতাপনগরের শিশু-কিশোরদের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ ভাসমান সেতু। একসময় হাওলাদার পাড়া থেকে স্কুল ও বাজারে যাওয়ার সড়কটি নদীর পাড় ভাঙতে ভাঙতে নষ্ট হয়ে খালে পরিণত হয়। বাঁশ দিয়ে তৈরি সাঁকো নড়বড়ে হয়ে গেলে কয়েকজন শিশু বই-খাতাসহ পানিতে পড়ে যায়। এরপর শিশু-কিশোরেরা দল বেঁধে ইউনিয়ন পরিষদে যায়, আর তাদের চাপেই তৈরি হয় ভাসমান সেতু। এতে প্রায় ১৪০ জন শিক্ষার্থী স্কুলে যাওয়ার নিরাপদ পথ পেয়েছে, উপকৃত হয়েছে বড়রাও।
এলাকার প্রয়োজনের তালিকায় শিশুরা রেখেছে প্রতিটি পাড়ায় নিরাপদ পানি—বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও লবণমুক্ত পানি—এর ব্যবস্থা, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও খেলাধুলার নিরাপদ স্থান এবং বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ ও শিশুবান্ধব দুর্যোগ প্রস্তুতি।
তামান্না বলে, ‘সেতু যখন করতে পেরেছি, তখন অন্য কাজগুলোও করতে পারব। আপনারা আমাদের কিশোর গ্যাং না বলে কিশোর শক্তি বলুন; পারলে পাশে থাকুন।’




