গাজীপুরের কাপাসিয়ায় নিজের দিনমজুরির টাকায় তিন সড়কে ১১টি যাত্রীছাউনি গড়লেন বাবুল শেখ

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার দিনমজুর বাবুল শেখ নিজের টাকায় তিনটি সড়কের চার থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে ১১টি যাত্রীছাউনি নির্মাণ করেছেন। বয়স পঞ্চাশের বেশি এই মানুষটির বাড়ি উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের বড়সিট গ্রামে।
দুই বছর আগে কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কের পাতলা মোড়ে বৃষ্টির মধ্যে কোলের শিশুকে আগলে বাসের জন্য অপেক্ষা করা এক মায়ের দৃশ্য দেখে তিনি এই কাজের সিদ্ধান্ত নেন। এক হাতে সন্তান ও অন্য হাতে ভারী ব্যাগ সামলানো ওই মায়ের জন্য সড়কের পাশে কোনো ছাউনি ছিল না।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরের এক বিকেলে বাঁশ, কাঠ, চাটাই ও পলিথিন নিয়ে বাবুল শেখ পাতলা মোড়ে যান এবং সেখানে প্রথম যাত্রীছাউনিটি তৈরি করেন। দেড় মাস পর একই স্থানে সড়কের উল্টো দিকে আরেকটি যাত্রীছাউনি ও একটি শৌচাগার নির্মাণ করেন তিনি।
এরপর ২০২৫ সালে তিনি আরও চারটি এবং চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে বাকি পাঁচটি যাত্রীছাউনি তৈরি করেন। সব মিলিয়ে কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কে আটটি, কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ সড়কে একটি এবং পাতলা-বড়সিট সড়কে দুটি ছাউনি গড়েছেন তিনি। বাবুল শেখ ৩ নভেম্বর প্রথম আলোকে এই ধারাবাহিকতা জানান।
ছাউনিগুলো বাঁশ, কাঠ, চাটাই ও মোটা পলিথিন দিয়ে তৈরি। কোনোটি লম্বায় সাত ফুট ও প্রস্থে পাঁচ ফুট, কোনোটি লম্বায় পাঁচ ফুট ও প্রস্থে চার ফুট। কোনোটিতে একটি বেঞ্চ, কোনোটিতে চার থেকে পাঁচটি বেঞ্চ পাতা আছে।
বাবুল শেখ জানান, ছোট ছাউনি তৈরিতে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা এবং বড় ছাউনিতে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। শৌচাগার নির্মাণে রিং-স্ল্যাব, প্যান ও টিনসহ উপকরণ কিনতে লেগেছে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। কোনো শ্রমিক না নিয়ে সব কাজ তিনি নিজেই করেছেন।
নির্মাণের পর রক্ষণাবেক্ষণও তিনি নিজে করেন। শৌচাগারে পানির ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন বোতলে পানি ভরে রাখেন এবং ব্যবহারের পর নোংরা হলে নিজেই পরিষ্কার করেন। এ কাজ করতে গিয়ে বিরূপ মন্তব্যও শুনতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর ভাষায়, ‘অনেকে বলে, আমি পাগলামি করছি। আমি তাদের কথায় গুরুত্ব দিই না।’
পাতলা মোড়ের প্রথম ছাউনিতে ৩ নভেম্বর বাসের জন্য অপেক্ষা করা যাত্রী বেদন মিয়া বলেন, সড়কের পাশে বসার ব্যবস্থা থাকায় যাত্রীদের অনেক সুবিধা হয়েছে, রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হলে অনেক কষ্ট হতো। বড়সিট গ্রামের বাসিন্দা মো. রিয়াদ বলেন, শৌচাগারটি হওয়ায় পথচারীদের সুবিধা হয়েছে।
পাতলা গ্রামের বাসিন্দা উবায়দুল্লাহ আকন বলেন, বাবুল শেখ গ্রামের বিভিন্ন সড়কের পাশের ঝোপঝাড়ও মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করেন, তিনি সরল মানুষ এবং কারও সঙ্গে কখনো তর্কে জড়ান না। যে তিন সড়কে ছাউনিগুলো তৈরি হয়েছে, তার একটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের এবং অন্য দুটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন।
এলজিইডির কাপাসিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা ও কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুল হক উদ্যোগটিকে প্রশংসনীয় বলেছেন। বৃহস্পতিবার বিষয়টি শোনার পর দুজনই বলেছেন, তাঁরা বাবুল শেখের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
বসতঘর ছাড়া তেমন কিছু নেই বাবুল শেখের। দিনমজুরির পাশাপাশি বাড়িতে ছোট আকারে মুরগির খামার করেছেন তিনি। তাঁর এক মেয়ে ও দুই ছেলে; মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, ছোট ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে এবং বড় ছেলেকে সাত মাস আগে আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করে বিদেশে পাঠিয়েছেন। কেন এই কাজ করেন—এই প্রশ্নে তাঁর উত্তর, ‘ছোট কাজেও যদি মানুষের উপকার হয়, তাতেই আমি খুশি।’
তাঁর স্ত্রী সালমা খাতুন বলেন, আগে স্বামীর এই কাজকে তাঁর পাগলামি মনে হতো। এখন মানুষের উপকার হচ্ছে ও মানুষ ভালো বলছে দেখে তাঁর নিজেরও ভালো লাগে।




