জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ: গ্রেপ্তার ৪৪৮, আহত ৫৩ পুলিশ
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি ও বৈষম্যের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ করেছেন লাখো মানুষ। দেশটির বিভিন্ন শহরে ধর্মঘট পালন করে কর্মস্থল ছেড়ে রাস্তায় নামেন শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ। তবে আন্দোলনের অন্যতম আয়োজক শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দাবি করেছে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভের ঘটনায় অন্তত ৪৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৫৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকারের বিরুদ্ধে নতুন করে জোরালো হয়ে ওঠা এই আন্দোলনে কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষও ঘটেছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, সব শ্রেণির কর্মীর বেতন বাড়ানো, করব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে সিজিটি ইউনিয়নের প্রধান সোফি বিনে বলেন, শ্রমিকেরা জয়ী হবেন কি না, সেটি প্রশ্ন নয়; বরং তারা কতটা দাবি আদায় করতে পারবেন, সেটিই এখন বিবেচ্য।
গত সেপ্টেম্বর থেকে ফ্রান্সে ধারাবাহিক বিক্ষোভ চলছে। সরকারি স্কুলগুলোর দুরবস্থা ও সুযোগ-সুবিধার অভাবের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এর সূচনা হয়। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয় এটি। গত ১৭ অক্টোবর দেশটিতে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গার ঘটনাও ঘটে।
বৃহস্পতিবারের এক দিনের ধর্মঘটে শিক্ষক, রেলকর্মী, হাসপাতাল ও ডাক বিভাগের কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন অংশ নেয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেন জ্বালানি খাতের কিছু কর্মীও।
প্যারিসে শুরুতে বিক্ষোভের পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর। প্লাস দ্য লা রিপাবলিক থেকে বিকেলে মিছিল শুরু হলে অংশগ্রহণকারীরা ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত ‘লা মার্সেইয়েজ’ গেয়ে এগিয়ে যান। তবে মিছিল শুরুর প্রায় দুই ঘণ্টা পর সামনের সারিতে থাকা কিছু বিক্ষোভকারীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এ সময় কয়েকটি দোকান ও স্থাপনায় ভাঙচুর ঘটে। প্যারিসের আশপাশের কয়েকটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি স্কুলে আগুন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
লিয়ঁ শহরেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। সেখানে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা কয়েক শ বিক্ষোভকারী পুলিশের মুখোমুখি হন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং তাদের ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান চালায়। এ সময় একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।
বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতা ঠেকাতে দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছিল সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ আগেই সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তবে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ এবং বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বেতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে আলোচনায় বসার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নুর। আগামী সোমবার শ্রমিক সংগঠন ও নিয়োগকর্তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।
আগামী এপ্রিলের নির্বাচনের পাঁচ মাস আগে এই আন্দোলন মাখোঁ সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী নেতা মেরিন লো পেনকে এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সের এই অসন্তোষ ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়া জীবনযাত্রার মান নিয়ে উদ্বেগের বৃহত্তর চিত্রের অংশ; সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জার্মানি, স্পেন, গ্রিস ও ইতালিতেও তরুণেরা একই ধরনের বিক্ষোভ করেছেন।



