ভাঙন আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই চরের জীবন: চিকিৎসা, ন্যায্য দাম আর নিরাপদ বসতির দাবি চরবাসীর

নদীর পানি বাড়ে, কখনো কমে। কোথাও নতুন করে জেগে ওঠে চর, কোথাও আবার ভাঙনের মুখে হারিয়ে যায় বসতভিটা। গত মৌসুমে যে জমিতে ফসল ফলেছিল, এ মৌসুমে সেখানে বয়ে যেতে পারে নদীর স্রোত। ঘর, জমি আর জীবিকার এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন কাটে বাংলাদেশের উপকূলীয় চরাঞ্চলের মানুষের।
খুলনার দুবলার চর, বরগুনার মাঝের চর, ছৈলার চর, লালদিয়ার চর, ফাতরার চর ও নিদ্রার চর; পটুয়াখালীর চরকাজল, চর মোন্তাজ ও আন্ডারচর; ভোলার চরফ্যাশন, চর কুকরি-মুকরি, মনপুরা ও ঢালচরের মতো এলাকায় মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এসব চরাঞ্চলের পরিবেশ, জীবিকা ও ভৌগোলিক অবস্থান এক রকম নয়, তবে নদী ও সমুদ্রের প্রভাব তাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নদী, হ্রদ কিংবা সমুদ্রের বুকে পলি জমে যে নতুন স্থলভাগ সৃষ্টি হয়, সাধারণভাবে তাকে চর বলা হয়। নদীর স্রোত, জোয়ার-ভাটা ও পলি সঞ্চয়ের ফলে এসব এলাকার ভূমির আকার ও অবস্থান বদলে যায়। কোথাও নতুন জমি জেগে ওঠে, আবার কোথাও নদীভাঙনে বিলীন হয় বসতি ও ফসলি জমি। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, গবাদিপশু পালন, চারণভূমি ব্যবহার ও বনজ সম্পদ সংগ্রহের মতো নানা প্রয়োজনে মানুষ এসব এলাকায় বসতি গড়েছে।
চরের মানুষের কাছে বসতভিটা শুধু থাকার জায়গা নয়; এটি পারিবারিক স্মৃতি, পূর্বপুরুষের পরিচয় ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আশ্রয়। টিন, বাঁশ কিংবা পলিথিন দিয়ে তৈরি ছোট ঘরটিও তাদের কাছে অনেক মূল্যবান। ঝড়ের রাতে ঘর উড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কিংবা নদীর পানি বাড়লে ভিটেমাটি হারানোর ভয় থাকলেও অনেকেই সহজে সেই জায়গা ছেড়ে যেতে চান না।
চরাঞ্চলে একটি কথা প্রচলিত — ‘চরের জীবন পরের হাতে’। বিপদে প্রতিবেশী পাশে না দাঁড়ালে কিংবা অসুস্থতার সময় কেউ সাহায্যের হাত না বাড়ালে সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নদীভাঙন, ঝড় কিংবা বন্যার সময় এক পরিবারের বিপদ দ্রুত অন্য পরিবারের উদ্বেগে পরিণত হয়; কারও ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসেন।
চরের অর্থনীতি মূলত স্থানীয় সম্পদ ও শ্রমনির্ভর। কেউ কৃষিকাজ করেন, কেউ মাছ ধরেন, কেউ গবাদিপশু পালন করেন। অনেকে দিনমজুরি, কাঠ সংগ্রহ, ছোট দোকান কিংবা দর্জির কাজের মাধ্যমে সংসার চালান। কাজের সুযোগ ও আয় নির্ভর করে ঋতু, আবহাওয়া, যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থানীয় বাজারের ওপর। খাদ্যতালিকায় স্থানীয়ভাবে পাওয়া মাছ ও শাকসবজি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।
ভোলার ঢালচরের সবজি বিক্রেতা হাতেম আলী চরের মানুষের শ্রমনির্ভর জীবনের কথা তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যের মূল কথা, এখানকার মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে অল্প আয়েও সংসার চালানোর চেষ্টা করেন। প্রয়োজনের তুলনায় কম পেয়েও অনেকে অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জনের পথে যেতে চান না; প্রতিকূলতার মধ্যেও সৎভাবে বেঁচে থাকার এই মানসিকতাকেই তিনি চরবাসীর বড় শক্তি হিসেবে দেখেন।
সরেজমিন কথা বলে জানা গেছে, অনেক চরাঞ্চলে উন্নত চিকিৎসাসেবা, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা ও জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ সীমিত। ফলে অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার সময় সাধারণ সমস্যাও বড় সংকটে রূপ নেয়।
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচরের চিকিৎসক শরীফ মিয়া বলেন, ‘চরে চিকিৎসাসেবার সুযোগ খুবই সীমিত। সাধারণ অসুস্থতায় মানুষ স্থানীয় ফার্মেসি থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনে খান। তবে রোগের ধরন বুঝতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, উন্নত চিকিৎসা কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হলে চর থেকে উপজেলা সদরে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ — দুটিই বেশি ব্যয় হয়। বিশেষ করে জরুরি অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।’ তিনি বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা বাড়ানো জরুরি।
চরবাসীর আরেকটি বড় প্রশ্ন, তাদের উৎপাদিত পণ্য ও আহরিত মাছের ন্যায্য মূল্য পাওয়া। বাজারে পৌঁছানোর খরচ, পরিবহনের অসুবিধা, সংরক্ষণব্যবস্থার ঘাটতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা অনেক সময় কৃষক ও জেলেদের আয় কমিয়ে দেয়। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজের বাধঘাট বাজারে স্থানীয়দের সঙ্গে এক আড্ডায় দাবি ওঠে — কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, মাছ দ্রুত শহরের বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা এবং নদীভাঙন থেকে বসতি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে চরবাসীর জীবন অনেকটাই স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল বলেন, ‘চরাঞ্চলের মানুষ প্রকৃতির অনিশ্চয়তার সঙ্গে বসবাস করতে শিখেছেন। তাদের জীবনে সংকট আছে, সীমাবদ্ধতা আছে, আবার রয়েছে শ্রম, অভিযোজনের ক্ষমতা ও সামাজিক সহযোগিতার অভিজ্ঞতা। তবে চরবাসীর সহনশীলতাকে এমনভাবে দেখা উচিত নয়, যেন প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করাই তাদের নিয়তি।’ তিনি মনে করেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, উন্নত যোগাযোগ, মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা, কৃষি ও মৎস্যপণ্যের ন্যায্য বাজার এবং বাস্তবসম্মত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে চরাঞ্চলের মানুষ আরও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়তে পারবেন।



