টেকনাফে নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখের মরদেহ যাচ্ছে গ্রামের বাড়ি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের প্রস্তুতি

কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখের মরদেহ গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দায় নেওয়া হচ্ছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে; পরে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
বৃহস্পতিবার বিকালে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালী গ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মানবপাচারবিরোধী যৌথ অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে অভিযানে বিজিবি ও পুলিশ অংশ নেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মানবপাচারের উদ্দেশ্যে শতাধিক বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাকে অপহরণ করে পাহাড়ের একটি গোপন আস্তানায় আটকে রাখা হয়েছিল; সেখানে তাদের নির্যাতন করা হচ্ছিল বলেও যৌথবাহিনীর কাছে তথ্য ছিল। অভিযানের সময় পাচারকারী চক্রের সদস্যরা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সৈনিক তিতাস শেখ গুলিবিদ্ধ হন।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে গুলিবিদ্ধ তিতাস শেখকে প্রথমে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই অভিযানে জিম্মি অবস্থায় থাকা ৫৭ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে পাঁচজনকে। এ ছাড়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।
শুক্রবার সকালেও পাহাড়ি এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত ছিল। পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছেন বাহিনীর সদস্যরা। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেছেন, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি ঘটনাস্থলসহ আশপাশের এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে; মানবপাচারকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং সন্ত্রাসী তৎপরতা নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
তিতাস শেখ টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। তিনি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাসিন্দা। সেনাবাহিনী পরিবারের সদস্য ছিলেন তিনি—তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য এবং ছোট ভাইও সেনাবাহিনীতে কর্মরত। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন তিতাস শেখ।
শুক্রবার সকালে লস্করদিয়া গ্রামে তিতাস শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলেকে হারিয়ে মা রেখা বেগমের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। ছেলেকে হারিয়ে বাবার মুখ দিয়েও কোনো কথা বের হচ্ছে না, শুধু ঝরছে চোখের পানি। তার মৃত্যুর খবরে পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার বছর আগে বিয়ে হয় তিতাস শেখের; তাদের কোনো সন্তান নেই। আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে কর্মস্থলে নেওয়ার কথা ছিল তার।
স্বামীকে হারিয়ে বিলাপ করে স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকবো! আমার কোনো অস্তিত্ব রইলো না! আল্লাহ, আমি এখন কী করবো।’
মা রেখা বেগম জানিয়েছেন, গত বুধবার রাতে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল। তিতাস তখন বলেছিল, ‘আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকালে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাবো, দোয়া কইরো মা।’ সেই কথাই যে শেষ কথা হবে, তা তিনি আঁচ করতে পারেননি।
মরদেহ রামু সিএমএইচে ছিল; লাশ আনতে সেখানে ছুটে গিয়েছেন ছোট ভাই সেনাসদস্য আকরাম হোসেন। নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, ‘সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে হেলিকপ্টারযোগে লাশটি বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে পৌঁছাবে বলে সেনাবাহিনী আমাদের জানিয়েছে। পরে গ্রামের বাড়িতে বিকাল ৪টার মধ্যে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা গার্ড অব অনারসহ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হবে। এরপর পারিবারিক সিদ্ধান্তে দাফন করা হবে।’
নগরকান্দা থানার ওসি রসুল সামদানী জানান, সেনাসদস্য তিতাস শেখের মৃত্যুর খবর তারা পেয়েছেন। মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
এদিকে তিতাস শেখের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছে আইএসপিআর। এক শোকবার্তায় বলা হয়, দেশমাতৃকার সেবায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই তরুণ সেনাসদস্যের আত্মত্যাগ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে। একই সঙ্গে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে।




