ঢাকাকে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন করতে ১২ দফা পরিকল্পনা, পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ গাছ ও ২৫০ বৈদ্যুতিক বাসের উদ্যোগ
রাজধানী ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপ দিতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের ধোঁয়া কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, খাল পুনরুদ্ধার, বৃক্ষরোপণ ও নগর সৌন্দর্যবর্ধনকে সামনে রেখে নেওয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে যুক্ত করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এসব কর্মসূচি। সরকারের লক্ষ্য, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে এনে রাজধানীকে বসবাসের উপযোগী করা।
গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরীতে রূপান্তরের ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ গাছ লাগানো। মেট্রোরেল লাইনের মিরপুর-১২ থেকে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত এবং উড়ালসড়কের আবদুল্লাহপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ফাঁকা জায়গায় বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে নগর বন গড়ে তোলা হচ্ছে। সড়কের উন্মুক্ত মিডিয়ানগুলোকে মাটিমুক্ত সবুজায়নের আওতায় আনা এবং রাস্তার পাশে গাছ লাগানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। কোরীয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর লক্ষ্য বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমানো। একই সঙ্গে নগরীর বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সড়কের মিডিয়ান, ট্রাফিক আইল্যান্ড ও উন্মুক্ত জায়গায় বৃক্ষরোপণ করছে। দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশক নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক সচেতনতা কর্মসূচিও চলছে।
রাজধানীর বায়ুদূষণ কমাতে পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে আধুনিক বাসসেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৫০টি বৈদ্যুতিক বাস পরিচালনার কথা জানানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক বাস চালু হলে জ্বালানিচালিত যানবাহনের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবহন খাতের দূষণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়ার আশা করছে সরকার।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলো শনাক্ত করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন, নির্মাণকাজ ও নির্মাণসামগ্রী থেকে সৃষ্ট দূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। ঢাকার আশপাশের অবৈধ ইটভাটা বন্ধেও অভিযান চলছে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণে সাভার উপজেলাকে অবক্ষয়িত বায়ুমান এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে ইটভাটা পরিচালনা ও খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রাজধানীর পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনরুদ্ধার, সীমানা নির্ধারণ, খনন ও বর্জ্য অপসারণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ২৯টি খালের সীমানা নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। দক্ষিণ সিটির খালগুলোর সীমানা নির্ধারণের কাজও চলছে।
রাজধানীর আশপাশের নদী ও জলাশয় রক্ষায় শিল্পকারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তরল বর্জ্য নির্গমনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ২৪৮টি প্রতিষ্ঠান ইটিপি স্থাপন করেছে। এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে।
বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদী এবং ঢাকার ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ খালের দূষণের উৎস ও ধরনও শনাক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রমকে আরও পরিকল্পিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের এই পরিকল্পনার পাশাপাশি দূষণ নিয়ন্ত্রণে আদালতের নির্দেশও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ২ নভেম্বর হাইকোর্ট ২০২০ সালের নয় দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। সড়কে পানি ছিটানো, নির্মাণস্থল ঘিরে রাখা, বালুবাহী ট্রাক ঢেকে পরিবহন এবং অবৈধ ইটভাটা বন্ধের মতো বিষয়গুলো নির্দেশনায় রয়েছে। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৬ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

