স্মৃতিভ্রংশের অনেক বছর আগেই মস্তিষ্কে মিলতে পারে আলঝেইমারের পূর্বলক্ষণ, গবেষণায় নতুন স্কোর

স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়ার অনেক বছর আগেই মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক যোগাযোগের সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখে আলঝেইমার রোগের ঝুঁকি আঁচ করা যেতে পারে—এমনটাই বলছে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা। স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের গবেষকেরা মস্তিষ্কের স্ক্যান ও কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে এই প্রাথমিক লক্ষণগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করেছেন।
গবেষকেরা দুটি বিপরীত ধরনের গোষ্ঠীর বিশ্রামকালীন মস্তিষ্কের স্ক্যান পরীক্ষা করেছেন: একদিকে আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত রোগীরা, অন্যদিকে ‘সুপার এজার’ নামে পরিচিত বয়স্ক ব্যক্তিরা, যাদের স্মৃতিশক্তি বহু দশক কম বয়সীদের সমতুল্য।
অ্যামাইলয়েড ফলক জমা বা মস্তিষ্ক সংকুচিত হওয়ার মতো শারীরিক চিহ্ন খোঁজার বদলে গবেষকেরা মনোযোগ দিয়েছেন মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে, সেই ধরনের ওপর।
দুটি গোষ্ঠীর মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ধরন তুলনা করে তাঁরা একটি পরিমাপ তৈরি করেছেন, যার নাম ‘আলঝেইমারস রেজিলিয়েন্স-ভালনারেবিলিটি কানেক্টোম স্কোর’, সংক্ষেপে এআরসি স্কোর। এই স্কোর প্রায় ৮৫ শতাংশ নির্ভুলতায় সুপার এজারদের আলঝেইমার আক্রান্তদের থেকে আলাদা করতে পেরেছে।
গবেষণাটির জ্যেষ্ঠ লেখক ও স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের মনোরোগ ও আচরণবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইউ ঝাং এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘আমরা এমন একটি চিহ্ন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি, যা দেখে আমি উচ্ছ্বসিত। এটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে, কারা চমৎকার জ্ঞানীয় সক্ষমতা ধরে রাখতে পারেন আর কাদের ক্ষেত্রে সেই সক্ষমতা কমে যায়—এই পার্থক্যটা কোথায়।’
এরপর বিজ্ঞানীরা এই স্কোরিং মডেলটি প্রয়োগ করেন ৫৫ থেকে ৭০ বছর বয়সী ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি জ্ঞানীয়ভাবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের ওপর। স্মৃতি পরীক্ষায় তাঁদের সবার ফল স্বাভাবিক থাকলেও মস্তিষ্কের স্ক্যানে পার্থক্য ধরা পড়ে: কারও কার্যকলাপের ধরন সুপার এজারদের মতো, আবার কারও ধরন আলঝেইমার রোগীদের মতো।
সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত অনুসরণকালীন পর্যবেক্ষণে—যেখানে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীকে পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়—দেখা গেছে, যাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ আলঝেইমার ধরনের সঙ্গে বেশি মিলেছে, তাদের স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি দ্রুত কমেছে, মস্তিষ্কে বেশি অ্যামাইলয়েড ফলক তৈরি হয়েছে এবং তাদের আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি ছিল।
গবেষক দলটি দেখেছে, প্রাথমিক অবনতি শনাক্তে এআরসি স্কোর প্রচলিত ঝুঁকির পরিমাপগুলোর সমান বা তার চেয়ে ভালো ফল দিয়েছে—এর মধ্যে রয়েছে অ্যামাইলয়েড ও টাউ জৈবচিহ্ন এবং জিনগত পরীক্ষা।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের পোস্টডক্টরাল গবেষক কানহাও ঝাও বলেন, ‘আমাদের মডেল তুলনামূলক বা আরও ভালো পূর্বাভাস দিতে পারছে, আর তা পারছে আরও প্রাথমিক পর্যায়ে। আর এই স্কোরকে বিদ্যমান জৈবচিহ্নগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে নিলে পূর্বাভাসের সক্ষমতা আরও বেড়ে যায়।’
বড় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আলঝেইমার রোগ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি বয়স্ক মানুষকে আক্রান্ত করে। এই রোগের চিকিৎসার বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রোগীরা স্মৃতি দুর্বল হওয়া লক্ষ্য করার কয়েক দশক আগেই শারীরিক ক্ষতি শুরু হয়ে যায়; সেই পর্যায়ে পৌঁছালে চিকিৎসার সুফল সীমিত হয়ে পড়ে।
তবে গবেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, শুধু এই মস্তিষ্ক স্ক্যান পদ্ধতি ব্যবহার করে রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকেরা এখনই প্রস্তুত নন। এর নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে এবং অন্যান্য নতুন পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করতে আরও গবেষণা দরকার।
তাঁদের মতে, সুস্থ বার্ধক্য ও স্নায়ুক্ষয়ের মধ্যে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের পার্থক্য বোঝা গেলে ভবিষ্যতের চিকিৎসা পরীক্ষায়ও তা কাজে লাগতে পারে—যার মধ্যে রয়েছে অস্ত্রোপচার ছাড়াই মস্তিষ্ক উদ্দীপিত করার কৌশল। ইউ ঝাং বলেন, ‘এর দুটি প্রধান দিক আছে: এক, মস্তিষ্কের কোন অংশকে লক্ষ্য করতে হবে তা জানা; দুই, কীভাবে তা পরিবর্তন করতে হবে তা জানা। তাই সুপার এজারদের মস্তিষ্কের সহনশীলতার ধরনটি শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কারণ তাহলেই আমরা জানব, ভালো ধরনটি দেখতে কেমন হওয়া উচিত।’




