মেঘনায় গুলিতে জেলে আকতার নিহত: প্রতিবেদনে ‘অজ্ঞাত প্রতিপক্ষ’, সঙ্গীদের অভিযোগ নৌ পুলিশের দিকে

মেঘনা নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে নয় দিন আগে গুলিতে নিহত হন জেলে আকতার হাওলাদার (৪০)। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অজ্ঞাত প্রতিপক্ষের রাবার বুলেটে’ তিনি নিহত হয়েছেন। তবে আকতারের সঙ্গী জেলেরা বলছেন, চাঁদপুর নৌ পুলিশের টহল দলের গুলিতেই তিনি মারা গেছেন।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৯ অক্টোবর ভোর ৫টার দিকে। হিজলা উপজেলার মেঘনার ওরাকুল এলাকায় মাছ ধরার সময় গুলিবিদ্ধ হন আকতার। তিনি একই উপজেলার চরমেমানিয়া গ্রামের সুজন হাওলাদারের ছেলে। সেদিন ছিল ইলিশ আহরণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার শেষ দিন।
আকতারের সঙ্গী আব্দুল ব্যাপারী বলেন, নৌকায় তাঁরা ১৩ জন জেলে ছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়ে গেছে। ফজরের আজানের কিছুক্ষণ পর একটি ট্রলারে একদল পুলিশ এসে তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
ওই গুলিতে আকতারসহ দুই জেলে গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত আকতারকে প্রথমে হিজলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
নৌকায় থাকা জেলেরা জানিয়েছেন, চাঁদপুর নৌ পুলিশের টহল দল এই হামলা চালিয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা একই সময়ে অন্য একটি ট্রলার থেকে কয়েকজনকে আটক করে চাঁদপুরে নিয়ে যায়।
এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চাঁদপুর অঞ্চলের নৌ পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমানসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। তবে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে বরিশাল জেলা পুলিশ সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৯ অক্টোবর ভোর ৫টার দিকে হিজলার গৌরবদী ইউনিয়নের ওরাকুলের পূর্ব দিকে মেঘনার বালুমহাল এলাকায় ৮ থেকে ১০ জন মাছ ধরতে গেলে অজ্ঞাত প্রতিপক্ষের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে অজ্ঞাত প্রতিপক্ষ রাবার বুলেট ছুড়লে আকতার হাওলাদার বুকে ও ডান ঘাড়ে আঘাত পান। এ ছাড়া আব্দুল ব্যাপারী নামের আরেকজন আহত হন।
এ প্রসঙ্গে বরিশাল জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মুলাদী সার্কেল) তারেক আমান বান্না বলেন, তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানেন না। এটি তাঁদের বিষয় নয়, নৌ পুলিশের তদন্তাধীন বিষয়। ভুক্তভোগী পক্ষ মামলা করতে চাইলে নৌ পুলিশের কাছে করতে পারে, পরে সেটি স্থানীয় থানা তদন্ত করবে বলে তিনি জানান।
নৌ পুলিশের বরিশাল অঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. ইমরান হোসেন মোল্লা বলেন, মেঘনার ঘটনার বিষয়ে প্রতিবেদন তাঁরা ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠিয়েছেন। এর বেশি কিছু বলতে তিনি অস্বীকার করেন।
আকতার গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলেও এখনো কোনো মামলা হয়নি। হিজলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোলায়মান হোসেন এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় তাঁদের কাছে কোনো সূত্র নেই। নদীপথের ঘটনা বলে তাঁরা বিষয়টি দেখছেন না, তবে হিজলা নৌ পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।
মেমানিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আফসার উদ্দিন বলেন, তাঁরা নিশ্চিত, চাঁদপুর নৌ পুলিশ গুলি করে আকতারকে হত্যা করেছে। তাঁর ভাষায়, জেলেরা গরিব; হয়রানির ভয়ে তাঁরা কেউ মুখ খুলছেন না। হয়রানির ভয়েই নিহতের পরিবার এখনো মামলা করেনি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, অভিযুক্ত বাহিনীর বাইরে বিচার বিভাগীয় বা স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।


