এক বছরে ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে ৩৫ শতাংশ, গভীর সংকটে দেশের আবাসন খাত
ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন দাম বৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশের আবাসন খাতে সংকট আরও গভীর হচ্ছে। আবাসন ব্যবসায়ীদের হিসাবে, গত এক বছরে দেশে ফ্ল্যাটের বিক্রি কমেছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে আবাসন খাতের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক সহযোগী শিল্প ও কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
মূল্যস্ফীতির চাপে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বেড়েছে। এতে মানুষের সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহও হ্রাস পাচ্ছে। অনেক পরিবারের কাছে ফ্ল্যাট কেনা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন সিদ্ধান্ত হয়ে উঠেছে।
রাজধানী ঢাকায় নিজের একটি ফ্ল্যাটের স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। কিন্তু চাহিদা থাকা সত্ত্বেও উচ্চমূল্য ও ঋণের ব্যয় বাড়ায় সেই স্বপ্ন পূরণ কঠিন হয়ে উঠেছে। রাজধানীর জনসংখ্যা আড়াই কোটির বেশি হলেও ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের নিজস্ব আবাসন নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি মানুষ নিজস্ব আবাসনের বাইরে রয়েছেন, যাঁদের বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য।
ফ্ল্যাট কেনার জন্য অনেক পরিবার বছরের পর বছর সঞ্চয় করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা এবং সন্তানের শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই সঞ্চয়ের বড় অংশ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হচ্ছে। ফলে ফ্ল্যাট কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্কের অর্থ জমাতে পারছেন না অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা।
অন্যদিকে ব্যাংকঋণের সুদহার বেশি হওয়ায় ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রেও অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় নেওয়ার ঝুঁকি বিবেচনায় অনেকেই বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের দাবি, উচ্চ সুদের কারণে গৃহঋণের চাহিদাও কমেছে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের হিসাবে, গত এক বছরে নির্মাণসামগ্রীর দাম ৩১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত তিন বছরে ফ্ল্যাটের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। নির্মাণ ব্যয় বাড়ার কারণে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন প্রকল্পের দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে। এতে একদিকে নির্মাতাদের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে অনেক ফ্ল্যাট।
ফলে বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, চাহিদার তুলনায় আবাসনের ঘাটতি প্রায় তিন লাখ ইউনিটে পৌঁছেছে। চাহিদা থাকলেও ক্রয়ক্ষমতার অভাবে সেই চাহিদা বাস্তব বিক্রিতে রূপ নিচ্ছে না।
আবাসন খাতের গুরুত্ব শুধু ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রড, সিমেন্ট, ইট, বালু, স্যানিটারি সামগ্রী, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, টাইলস, দরজা-জানালা, পরিবহন ও শ্রমনির্ভর বিভিন্ন সেবাসহ এ খাতের সঙ্গে আড়াই শতাধিক সহযোগী ও উপশিল্প যুক্ত রয়েছে। ফলে আবাসন খাতে নতুন প্রকল্প কমে যাওয়া এবং ফ্ল্যাট বিক্রি স্থবির হলে এসব শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এ খাতের সঙ্গে যুক্ত ৫০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে রয়েছে। প্রকল্প কমে গেলে নির্মাণশ্রমিক থেকে শুরু করে সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এদিকে বাজারে মন্দার মধ্যেও যারা ফ্ল্যাট কিনছেন, তাঁদের একটি অংশ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেওয়া এবং অর্থ লেনদেনে প্রতারণার অভিযোগ তুলছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রেতারা কিস্তি ও অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করেও চুক্তি অনুযায়ী ফ্ল্যাট বুঝে পাচ্ছেন না। এতে ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং আবাসন ব্যবসার প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আবাসন খাতের সংকট কাটাতে নির্মাণ ব্যয় ও ঋণের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে আনার পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফ্ল্যাট নির্মাণ জরুরি। ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত আবাসন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীকেন্দ্রিক চাপও কমতে পারে।
একই সঙ্গে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময়সীমা মেনে চলা, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং ক্রেতাদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ না এলে আবাসন খাতের স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।



