পাতলা গড়নের মানুষেরও হতে পারে প্রিডায়াবেটিস, ঝুঁকির কারণ জানালেন পুষ্টিবিদ
অনেকে মনে করেন, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা থাকলেই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। পাতলা গড়নের মানুষেরও প্রিডায়াবেটিস হতে পারে। কারণ, রক্তে শর্করার মাত্রা শুধু শরীরের ওজনের ওপর নির্ভর করে না। বংশগত কারণ, শরীরে চর্বি জমার ধরন এবং জীবনযাপনের অভ্যাসও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রিডায়াবেটিস হলো এমন একটি অবস্থা, যখন রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, কিন্তু ডায়াবেটিস নির্ণয়ের পর্যায়ে পৌঁছায় না। এ অবস্থায় শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি ঠিকমতো সাড়া দিতে পারে না। একে বলা হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স।
ইনসুলিন একটি হরমোন, যা রক্তের গ্লুকোজকে শরীরের কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ না করলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
পেটে চর্বি জমা: শরীরের ওজন স্বাভাবিক হলেও পেটে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে। পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর চারপাশে জমে থাকা চর্বিকে ভিসারাল ফ্যাট বলে। এই চর্বি ইনসুলিনের কার্যকারিতায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে পাতলা গড়নের মানুষেরও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হতে পারে।
বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) দিয়ে উচ্চতা ও ওজনের অনুপাত বোঝা যায়। কিন্তু শরীরে কতটা চর্বি আছে বা কোথায় জমেছে, তা শুধু বিএমআই দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। তাই ওজন স্বাভাবিক দেখালেও শরীরের ভেতরে ঝুঁকি লুকিয়ে থাকতে পারে।
বংশগত কারণ: বাবা-মা বা ভাই-বোনের টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকলে নিজেরও এ রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। জিনগত বৈশিষ্ট্য শরীরের ইনসুলিন ব্যবহারের ক্ষমতা এবং অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসরণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ওজন স্বাভাবিক হলেও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকতে পারে।
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং নিয়মিত ব্যায়াম না করার কারণে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়তে পারে। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে চর্বির অস্বাভাবিক মাত্রা: উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের অস্বাভাবিক মাত্রা বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব সমস্যা থাকলে প্রিডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
প্রিডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে সাধারণত স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে অনেকে বুঝতে পারেন না যে তাঁদের রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। বাইরে থেকে সুস্থ দেখালেও শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকতে পারে।
প্রিডায়াবেটিস শনাক্ত করতে কয়েকটি পরীক্ষা করা হয়। খালি পেটে রক্তে শর্করা পরীক্ষা: রাতে নির্দিষ্ট সময় না খেয়ে থাকার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। এইচবিএ১সি পরীক্ষা: দুই থেকে তিন মাসে রক্তে শর্করার গড় মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট: নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্লুকোজ পান করার পর রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। এতে শরীর গ্লুকোজ কতটা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে, তা বোঝা যায়।
প্রিডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত হাঁটা ও অন্যান্য শারীরিক কার্যক্রমের অভ্যাস গড়ে তুলুন। ভাত বা রুটি পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার পাশাপাশি শাকসবজি, ডাল, ডিম, মাছ এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখুন খাদ্যতালিকায়। মিষ্টি পানীয় ও অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ কমান। দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটুন।
শরীরের ওজন স্বাভাবিক থাকলেও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জরুরি। তবে মনে রাখতে হবে, প্রিডায়াবেটিসের ঝুঁকি শুধু ওজন দেখে নির্ধারণ করা যায় না। তাই পরিবারের কারও টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকলে, পেটে অতিরিক্ত চর্বি জমলে, শারীরিক পরিশ্রম কম হলে কিংবা উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে চর্বির সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা উচিত। লিখেছেন লিনা আকতার, পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।




