মানব মস্তিষ্কের কোষ নিয়ে ইঁদুরের শরীরে গবেষণা: স্ট্যানফোর্ডের পরীক্ষা নিয়ে নৈতিক বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি গবেষণাগারে ইঁদুরেরা তাদের খাঁচায় ছোটাছুটি করছে, যেমনটা ইঁদুরেরা করে থাকে। কিন্তু তাদের মস্তিষ্কের ভেতরে রয়েছে লাখ লাখ কর্মক্ষম মানব নিউরন।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা মস্তিষ্কের অংশবিহীন করে জন্ম নেওয়া ইঁদুরের মস্তিষ্কে গবেষণাগারে তৈরি মানবকোষ প্রতিস্থাপন করেছেন। মস্তিষ্কের বাইরের স্তর সেরিব্রাল কর্টেক্সসহ মস্তিষ্কের যেসব অংশ অনুভূতি, চলাচল, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মনোযোগের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে, সেসব অংশ ছাড়াই ইঁদুরগুলোকে জিনগতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছিল।
নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, তথাকথিত এই 'এলিয়েন-কর্টিক্যাল ইঁদুর' স্নায়ুতন্ত্রের সংযোগ ও স্কিজোফ্রেনিয়া, সেরিব্রাল পালসি ও ডিমেনশিয়ার মতো মস্তিষ্কের রোগ নিয়ে গবেষণার নতুন উপায় দিতে পারে।
গবেষকেরা ইঁদুরগুলোকে এমনভাবে জিনগত পরিবর্তন করেছিলেন যাতে তারা সেরিব্রাল কর্টেক্সের বেশিরভাগ অংশ এবং তার পাশের হিপোক্যাম্পাস ছাড়াই জন্মায় ও বেড়ে ওঠে। চলাচল, শেখা ও স্মৃতির জন্য এই দুটি অংশ প্রয়োজন।
প্রাণীগুলোর বয়স যখন দুই দিন, তখন গবেষকেরা খালি জায়গাগুলোতে মানব 'অর্গানয়েড' ইনজেকশন দেন। অর্গানয়েড হলো স্টেম সেল বা টিউমারের কোষ থেকে গবেষণাগারে তৈরি কোষের ক্ষুদ্র পিণ্ড, যা আসল মানব অঙ্গের অনুকরণ করে। প্রতিটি অর্গানয়েড সুস্থ দাতাদের স্টেম সেল থেকে তৈরি এবং এতে প্রায় এক লাখ মানবকোষ রয়েছে।
সব মিলিয়ে গবেষকেরা প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ ইঁদুরের নিউরন সরিয়ে প্রায় ৪০ লাখ মানব নিউরন যোগ করেন। মোট ২৯টি ইঁদুরের ওপর এই প্রতিস্থাপন চেষ্টা করা হয় এবং ২৫টিতে তা সফল হয়।
তিন মাসের মধ্যে মানবকোষের টিস্যু ইঁদুরের মস্তিষ্কের ভেতরে প্রায় পাঁচ গুণ বড় হয়ে ওঠে, রক্ত সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং গহ্বরগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি পূরণ করে।
মানবকোষের টিস্যু মস্তিষ্কের আয়তনের প্রায় অর্ধেক জুড়ে থাকলেও 'এলিয়েন কর্টেক্স' ইঁদুরগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা ও শব্দ করেছে। গোলকধাঁধার পরীক্ষায় মানবকোষ ছাড়া ইঁদুরগুলো বারবার পথ হারালেও মানবকোষ থাকা ইঁদুরগুলো ভালো করেছে, যা থেকে মনে হয় মানবকোষের টিস্যু জ্ঞানীয় ক্ষমতায় অবদান রেখেছে।
অপ্রত্যাশিতভাবে কিছু টিস্যুতে ভন ইকোনোমো নিউরন তৈরি হয়েছে, যেগুলো লম্বা ও বিরল কোষ এবং সাধারণত ইঁদুরের মধ্যে থাকে না, আর গবেষণাগারে তৈরি করাও প্রায় অসম্ভব। মানুষ, বনমানুষ, তিমি ও হাতির মতো অত্যন্ত সামাজিক প্রাণীদের মধ্যে এসব কোষ পাওয়া যায়।
গবেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, এটি মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের মতো কিছু নয় এবং প্রাণীগুলো 'মানুষের মতো চিন্তা করা ইঁদুর' নয়।
গবেষণায় জড়িত একজন গবেষক বলেন, গত দুই দশক ধরে মানবদেহের বাইরে মানব মস্তিষ্কের মডেল তৈরির চেষ্টা চলছে। এটি আগের সব মডেলের জায়গা নেবে না, তবে মানব মস্তিষ্কের কার্যকারিতার এমন কিছু দিকের নাগাল দেবে যা অন্যভাবে অধ্যয়ন করা খুব কঠিন হতো।
অর্গানয়েড নিয়ে গবেষণা এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দাবিও জোরালো হচ্ছে, কারণ এই প্রযুক্তি সংবেদনশীল নৈতিক প্রশ্ন তোলে। প্রশ্নগুলো মূলত এই বিষয়ে—দেহের বাইরে বেড়ে ওঠা কোষের গুচ্ছ ও মস্তিষ্কের অনুভূতি বা চেতনার ক্ষমতা থাকতে পারে কি না, এবং তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা যায় কি না।
মানব স্নায়ুকোষ ইঁদুরের মস্তিষ্কে ছয় মাস বয়সী হওয়ার আগেই গবেষকেরা পরীক্ষাগুলো বন্ধ করে দেন, যাতে প্রাণীর মস্তিষ্কের সঙ্গে আরও স্নায়ুসংযোগ গড়ে ওঠার আগেই এবং চেতনার কোনো লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই তা থামে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান দিয়েগোর সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জন ইভান্স, যিনি এই গবেষণায় জড়িত ছিলেন না, বলেন, এই পরীক্ষাটি নিজে থেকে বড় নৈতিক সমস্যা তোলে না, তবে এটি প্রমাণ দেয় যে আরও গুরুতর নৈতিক উদ্বেগ তোলা অন্য প্রাণী তৈরি করা যেতে পারে। ইঁদুর থেকে অমানব প্রাইমেটের দিকে গবেষণা ধীরে ধীরে এগোনোর পথে স্পষ্ট থামার বিন্দুর অভাবই সমস্যা বলে তিনি মনে করেন। তাই নৈতিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে এমন মানব-প্রাণীর বৈশিষ্ট্য মেশানো নিউরোহাইব্রিড প্রাণী তৈরি এড়াতে গবেষকদের আপাতত ইঁদুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত বলে তিনি পরামর্শ দেন।

