গরম পানিও নেই, গাড়িতে ঘুম: মার্কিন সেনাদের ব্যারাকের করুণ চিত্র তুলে ধরলেন মেডেল অব অনার প্রাপ্ত মেয়ার

কিছু সেনা এক বছর ধরে গরম পানি ছাড়া কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণহীন ব্যারাক থেকে বাঁচতে গাড়িতে ঘুমাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ নিজেরাই মেরামতের জন্য ড্রাইওয়াল, স্প্যাকল আর রং চাইছেন—এমনই অবস্থা দেখেছেন মেডেল অব অনার প্রাপ্ত ডাকোটা মেয়ার।
মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথের দেওয়া দায়িত্বে তিনি দেশের সামরিক স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখছেন—দশকের পর দশক ধরে অবহেলায় জর্জরিত ব্যারাক ব্যবস্থা ঠিক করার কাজে।
বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকারে মেয়ার বলেন, ‘আমি বলব, আমি যতগুলো দেখেছি তার মধ্যে মাত্র দু-একটি ভালো।’ পেন্টাগনের ব্যারাক টাস্ক ফোর্সের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও মেরিন কোরের আটটির বেশি স্থাপনা ঘুরেছেন। বছরের শেষ নাগাদ ৩০টি স্থাপনা ঘোরার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
‘আমি ভেবেছিলাম এটা একটা পেশাদার কাজ হবে, কিন্তু খুব দ্রুতই এটা ব্যক্তিগত হয়ে গেল,’ বলেন মেয়ার। এক স্থাপনায় তিনি ১৯ বছর বয়সী এক নারী সেনাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, জাদুর কাঠি ঘোরাতে পারলে নিজের থাকার অবস্থা নিয়ে তিনি কী বদলাতে চাইবেন। মেয়ার স্মরণ করেন, ‘যদি তিনি শুধু একটা গরম গোসল পেতেন। এটা একেবারেই হৃদয়বিদারক।’
এক পরিদর্শনে তোলা ছবিতে ব্যারাকের ভেতরে দেয়াল ও আলমারিতে ব্যাপক ছত্রাক ও পানির ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে। আরেক ছবিতে দেখা গেছে, বিছানার ওপরে ঝুলছে ক্ষতিগ্রস্ত সিলিং। আরও একটি কক্ষে দেখা গেছে বেসিন ছাড়া সিঙ্ক এবং বাথরুমের সিলিংয়ের চারপাশে অস্থায়ীভাবে লাগানো আলো। জানালার এয়ার কন্ডিশনার ইউনিট ও ছত্রাক-পানির ক্ষতির ছবিও উঠে এসেছে পরিদর্শনে।
পেন্টাগনের ব্যারাক সমস্যা হেগসেথের আমলের অনেক আগের, এবং বারবার সংস্কারের চেষ্টা সত্ত্বেও তা টিকে আছে। ২০২৩ সালে সরকারি জবাবদিহি দপ্তরের (জিএও) এক ব্যাপক তদন্তে গুরুতর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নথিভুক্ত হয়। তদন্তে দেখা যায়, বিভাগের নিজের ব্যারাকের অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছিল না, সুবিধার জন্য ব্যয়ের কতটা ব্যারাকে গেছে তা নির্ধারণ করা যেত না এবং তদারকিও ছিল অপর্যাপ্ত।
এরপর কংগ্রেস ও সামরিক বাহিনীগুলো উন্নতির জন্য কোটি কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। মেরিন কোরের ‘ব্যারাকস ২০৩০’ থেকে শুরু করে নৌবাহিনীর অবিবাহিত আবাসন সংস্কার—নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবু গুরুতর সমস্যা রয়ে গেছে। এ বছর পর্যন্ত জিএওর ৩১টি সুপারিশের মধ্যে ১২টি এখনো বাকি রয়েছে।
হেগসেথ বিভাগজুড়ে একটি টাস্ক ফোর্সের অধীনে এই প্রচেষ্টাকে কেন্দ্রীভূত করে উন্নতি ত্বরান্বিত করতে চেয়েছেন। মেয়ার বলেন, মন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সমস্যা চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। ‘মন্ত্রী আমাকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি আশা করেন না আমি এটা পর্যবেক্ষণ করব, অধ্যয়ন করব বা এটাকে ভালো করব। তিনি আশা করেন আমি এটা ঠিক করব,’ বলেন মেয়ার। ‘আর আমরা ঠিক সেটাই করতে যাচ্ছি।’
মেডেল অব অনার পাওয়ার পর পুনরায় তালিকাভুক্ত হওয়া একমাত্র বীর মেয়ার বলেন, তাঁর প্রথম অনুরোধগুলোর একটি ছিল টাস্ক ফোর্সকে ‘কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা’ দেওয়া, যাতে আরেকটি তদারকির স্তর তৈরি না হয়। তাঁর ভাষায়, লক্ষ্য ছিল দলটিকে ‘বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার, প্রভাব ফেলার, পরিবর্তন আনার এবং তহবিল কোথায় যাবে ও কত দ্রুত আমাদের সেনাদের কাছে পৌঁছাবে তা নির্দেশ দেওয়ার’ ক্ষমতা দেওয়া।
মেয়ার বলেন, সমস্যাটা শুধু টাকার অভাব নয়। অর্থায়নের ঘাটতি, চলমান প্রস্তাব (কন্টিনিউয়িং রেজোলিউশন) এবং বছরের পর বছর ধরে পিছিয়ে থাকা রক্ষণাবেক্ষণ—সবই এর কারণ। তবে ঠিকাদারি নিয়ম ও আমলাতন্ত্রের স্তরও রয়েছে, যা তুলনামূলক সহজ মেরামতকেও ধীর করে দিতে পারে। আরেকটি তদারকি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পেন্টাগনের বৃহত্তর সামরিক সুবিধা খাতে ২৮৫ বিলিয়ন ডলারের রক্ষণাবেক্ষণ বকেয়া রয়েছে। ‘যখন আপনি ঠিকাদারির দিকটা দেখেন, তখন না বলাটাই মানুষের জন্য সহজ হয়,’ বলেন মেয়ার।
অর্থায়নও সমস্যার অংশ বলে জানান মেয়ার। তিনি ২০২৭ অর্থবছরের জন্য পূর্ণ বছরের প্রতিরক্ষা বরাদ্দ পাস করতে কংগ্রেসের ব্যর্থতার দিকে ইঙ্গিত করেন। পেন্টাগন বর্তমানে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলমান প্রস্তাবের অধীনে চলছে, যেখানে আগের বছরের হারে চলমান কর্মসূচিগুলো অর্থায়ন করা হয়। ‘যখন আপনি বাজেট পেতে পারেন না, যখন আপনি কংগ্রেসের বাজেট পাসের অপেক্ষায় থাকেন যাতে সেখানে অর্থ পৌঁছায়, মানে এটা একটা বিরাট সমস্যা,’ বলেন মেয়ার।
তবে তিনি আরও বলেন, পেন্টাগন প্রায়ই অগ্রগতি মাপে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে বা চুক্তি হয়েছে তা দিয়ে, সেনারা তাঁদের থাকার অবস্থায় আসলেই উন্নতি দেখছেন কি না তা দিয়ে নয়। ‘আমাদের সেনারা আমাদের বাজেট লাইনে থাকেন না,’ বলেন মেয়ার। ‘তাঁরা সেই কক্ষগুলোতে থাকেন, যেগুলোকে সেই বাজেট লাইনগুলো প্রভাবিত করার কথা।’ মেয়ারের ভাষায়, ওয়াশিংটন থেকে বেরিয়ে সেনাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলাই তাঁর কাজের মূল অংশ। ‘পেন্টাগনের কার্পেটের ওপর দাঁড়িয়ে আপনি এসব সমস্যা ঠিক করতে বা বুঝতে পারবেন না,’ বলেন তিনি। ‘আপনাকে বাইরে গিয়ে এই সেনাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
তিনি যা শুনেছেন, তা আংশিকভাবে চমকপ্রদ, কারণ সেনারা খুব কমই চাইছেন। ‘তাঁরা একটা গরম গোসল চাইছেন। তাঁরা কাপড় ধোয়ার জায়গা চাইছেন। তাঁরা তালা দেওয়া যায় এমন একটা দরজা চাইছেন। তাঁরা ছত্রাক ছাড়া একটা জায়গায় ঘুমাতে চাইছেন। মানে, তাঁরা বাল্ব চাইছেন।’ ‘তাঁরা সমাধানের অংশ হতে ইচ্ছুক,’ যোগ করেন তিনি।
স্থাপনার কমান্ডারদের একা দোষ দিতে রাজি নন মেয়ার। তাঁর মতে, অনেকেই অবস্থার উন্নতি চান, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে খারাপ ব্যারাককে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া ব্যবস্থার মধ্যে তাঁরা বাধাগ্রস্ত। ‘আমার মনে হয় এটা একটা বহুমাত্রিক সমস্যা, এবং এটা জটিল,’ বলেন তিনি। ‘আমার মনে হয় এমন কমান্ডাররা আছেন যারা তাঁদের সেনাদের দেখাশোনা করতে চান। আমি সর্বত্রই তা দেখেছি। কিন্তু... তাঁদের সেই সক্ষমতাও থাকতে হবে।’
আগের পেন্টাগন নেতৃত্বের প্রতি তিনি অনেক কম ক্ষমাশীল ছিলেন। তাঁর যুক্তি, বছরের পর বছর বিনিয়োগ ও সংস্কার উদ্যোগ সেনাদের থাকার উপযুক্ত অবস্থায় রূপ নেয়নি। ‘নিজেকে ধোঁকা দেবেন না,’ বলেন মেয়ার। ‘অতীতে... এটা নেতৃত্বের অগ্রাধিকার ছিল না।’ আগের প্রশাসন ও সামরিক নেতারা ব্যারাক উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করেছিলেন, তবু সরকারি তদারকি সংস্থাগুলো গুরুতর ঘাটতি নথিভুক্ত করতে থাকে।
মেয়ার বলেন, হেগসেথ বিষয়টিকে ব্যক্তিগত অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ‘আমাদের একজন যুদ্ধমন্ত্রী আছেন যিনি মানুষকে প্রথমে রাখছেন, এবং তিনি শুধু বলছেন না, তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে তা করছেন,’ বলেন তিনি। সর্বশেষ প্রচেষ্টা সফল হবে কি না, সে দায় নিজের নামে নিয়েছেন মেয়ার। তিনি আগেই বলেছেন, ব্যারাক ঠিক না হলে দোষ দেওয়ার ‘একজনই আছেন’—তিনি নিজে। ‘ঠিক করা’ বলতে আসলে কী বোঝায় জানতে চাইলে, পেন্টাগনের কোনো মাপকাঠির চেয়ে সহজ এক মানদণ্ড দেন মেয়ার। ‘মানুষ এমন জায়গায় থাকবে যেখানে আমার মেয়েদের থাকতে দিতে আমার আপত্তি থাকবে না,’ বলেন তিনি।



