দক্ষিণ আমেরিকায় প্রথম মাসে উরুগুয়ের পাইসান্দুতে পোপ লিও, জড়ো ৩০ হাজারের বেশি মানুষ

উরুগুয়ের পাইসান্দু শহরে শনিবার (৭ নভেম্বর) হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছেন পোপ লিও চতুর্দশের দক্ষিণ আমেরিকায় প্রথম গণপ্রার্থনা (মাস) উপলক্ষে। উরুগুয়ে নদীর তীরের এই শহরে আগে কোনো পোপ কখনো আসেননি।
পার্কে পারিস লন্দ্রেস নামের বিশাল সবুজ মাঠে আয়োজিত এই মাসে অংশ নিতে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ নাম নিবন্ধন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে উরুগুয়ের নাগরিকদের পাশাপাশি প্রতিবেশী আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে আসা অনেকেই ছিলেন।
ভোর সাড়ে পাঁচটায় ফটক খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির পোশাক পরা বিশ্বাসীরা মাঠে ঢুকতে শুরু করেন। অনেকের গায়ে ছিল ভ্যাটিকানের হলুদ রঙের পোশাক। এ সময় একটি ব্যান্ড জনপ্রিয় স্প্যানিশ স্তোত্র বাজাচ্ছিল।
পাইসান্দু রাজধানী মোন্তেভিদেও থেকে প্রায় ৩৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই মাস দিয়েই শুরু হলো পোপের তিন দেশের ১২ দিনের দক্ষিণ আমেরিকা সফরের প্রথম বড় কর্মসূচি। গত ১৩ অক্টোবর ফুসফুসের ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের পর এই সফর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল।
উত্তর উরুগুয়ে থেকে গাড়ি চালিয়ে আসা ৭৩ বছর বয়সী সোলেদাদ সানচেজ বলেন, পোপ খ্রিস্টের প্রতিনিধি হলেও তিনিও একজন মানুষ। তিনি আসতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন না, কিন্তু তিনি তাঁদের জন্য এসেছেন। তাঁর চোখে পানি এসে যায়। তিনি বলেন, পোপ শান্তির বার্তা দিতে এসেছেন, কারণ তিনি জানেন এই মুহূর্তে বিশ্বের তা প্রয়োজন।
জনসংখ্যা ৩৫ লাখের উরুগুয়ে এই অঞ্চলের সবচেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। পোপ শুক্রবার দেশটিতে পৌঁছেছেন। তিনি সেখানকার মানুষকে আজকের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ক্যাথলিক বিশ্বাসের দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানাতে চাইছেন।
শনিবার দিনের পরের দিকে পোপ মোন্তেভিদেওর একটি পাড়া ঘুরে দেখবেন, যেখানে মাদক পাচার ও গ্যাং সহিংসতা ব্যাপক। সেখানে গির্জা পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে আবাসন নির্মাণ ও মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের কাজ করছে।
দিনের শেষ কর্মসূচি হিসেবে মোন্তেভিদেওর সেনটেনারি স্টেডিয়ামে একটি প্রার্থনা সমাবেশে যোগ দেবেন পোপ। সেখানেও ধর্মের প্রতি উদাসীনতা প্রত্যাখ্যান করে বিশ্বাসকে গ্রহণ করার আহ্বান জানাবেন তিনি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় মোন্তেভিদেওর ক্যাথেড্রালে এক সান্ধ্য প্রার্থনায় পোপ স্বীকার করেন, এখানকার অনেক মানুষ বিশ্বাস সম্পর্কে জানেই না, এমনকি উরুগুয়ের স্বাধীনতা ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এই ঐতিহ্য সম্পর্কেও তাঁরা অবগত নন। ২০২৪ সালে ক্যাথলিক চার্চে কোনো নতুন সেমিনারিয়ান আসেননি, যদিও এরপর কয়েকজন পুরোহিত হওয়ার প্রশিক্ষণে ভর্তি হয়েছেন।
পোপ সেমিনারিয়ান, পুরোহিত ও বিশপদের উদ্দেশে বলেন, 'ধর্মপ্রচারের একটি রহস্য হলো যাঁকে আমরা ঘোষণা করি, তাঁর মতো হওয়া।' তিনি বলেন, এই ভূমিতে, যেখানে আমাদের অনেক সমসাময়িক মানুষ যিশু খ্রিস্টকে প্রায় চেনেই না এবং অনেক তরুণ গির্জার জীবন থেকে দূরে বড় হয়েছে, সেখানে এই সাক্ষ্যের বিশেষ শক্তি রয়েছে।
পশ্চিম উরুগুয়েতে অবস্থিত পাইসান্দু আর্জেন্টিনার পূর্বাঞ্চলীয় শহর কোলনের ঠিক বিপরীতে একটি সেতুর ওপারে। তাই আর্জেন্টিনার অনেকের কাছে এই শহরে পৌঁছানো সফরের অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে সহজ ছিল। উরুগুয়ের পর পোপ আর্জেন্টিনায় যাবেন এবং বুয়েনস আইরেস, লুহান ও কর্ডোবা সফর করবেন। এরপর তিনি তাঁর দ্বিতীয় স্বদেশ পেরুতে যাবেন, যেখানে সফর শেষ হবে।
আর্জেন্টিনার ২০ বছর বয়সী ভ্রমণ এজেন্ট লুসিয়ানা লোবাতো সীমান্তের ওপার থেকে ১৮০ জন তীর্থযাত্রীর বাসের ব্যবস্থা করেছেন। তিনি বলেন, আর্জেন্টিনা উরুগুয়ের চেয়ে অনেক বেশি ধর্মপ্রাণ দেশ, এবং ঐতিহাসিক কিছু প্রত্যক্ষ করার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
পাইসান্দুর ১৮ বছর বয়সী তেরেসা সাবেলিনি বলেন, তাঁর শহরের অনেক তরুণ ধর্মে সত্যিই আগ্রহী এবং কঠিন সময়ে অর্থ ও সম্প্রদায় খুঁজছে। তিনি বলেন, চারদিকে তাকিয়ে দেখুন, এই জায়গা মানুষে ভরে গেছে।
উরুগুয়েতে বসবাসকারী ১৮ বছর বয়সী কলম্বিয়ান সান্তিয়াগো বিগলিয়েরি বলেন, তিনি নিজেকে ধার্মিক বলবেন না, তবে এই পোপকে তাঁর পছন্দ। মানবতার জন্য তাঁর খুব ভালো বার্তা রয়েছে। অবিশ্বাসীদের জন্যও তাঁর ভাবনা থেকে কিছু নেওয়ার আছে।
শনিবারের এই মাসটি উৎসর্গ করা হয়েছে ধন্য জাসিন্তো ভেরাকে, যিনি উনিশ শতকের একজন পুরোহিত এবং উরুগুয়ের প্রথম বিশপ ছিলেন। শুক্রবার পোপ তাঁর প্রশংসা করে বলেন, তিনি দেশের রাস্তায় ঘুরে দরিদ্রদের সাহায্য করতেন এবং যাঁরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতেন, তাঁরা প্রচার শোনার আগেই তাঁর মধ্যে খ্রিস্টের মঙ্গলভাবের কিছুটা খুঁজে পেতেন।
তবে পাইসান্দু শহর পোপকে অনেকটা নীরবেই স্বাগত জানিয়েছে, যেন এটি একটি সাধারণ সপ্তাহান্ত। খুব কম সাজসজ্জা দেখা গেছে এবং মাত্র কয়েকটি বাড়িতে ভ্যাটিকানের পতাকা উড়তে দেখা গেছে।



