প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার পথে হাকিম জেফ্রিস, তবে দলের ভেতরেই প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটদের নির্ণায়ক জয়ের পর হাউসের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিস যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন। নিউইয়র্কের এই কংগ্রেস সদস্যের বয়স ৫৬ বছর।
জেফ্রিসের জন্য এটি হবে প্রায় দুই দশকের রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত অর্জন। স্পিকার হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরে তাঁকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ডেমোক্র্যাটদের প্রচেষ্টায় তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পাবেন।
নির্বাচনের পরদিন জেফ্রিস ‘ব্লু সুনামি’ — অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের ঢেউ — উদযাপন করলেও দলের ভেতরের সবাই তাঁকে এই মুহূর্তের জন্য সঠিক ব্যক্তি বলে মনে করছেন না। জেফ্রিস তাঁর সতর্ক রাজনৈতিক ধারা এবং ইসরায়েলের প্রতি দীর্ঘদিনের সমর্থনের জন্য পরিচিত।
চেঞ্জ ডট অর্গে একটি অনলাইন আবেদনে আইনপ্রণেতাদের অন্য কাউকে স্পিকার বেছে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। শনিবার সকাল পর্যন্ত ওই আবেদনে নয় লাখ ৮০ হাজারের বেশি স্বাক্ষর জমা পড়েছে।
নবনির্বাচিত কয়েকজন প্রগতিশীল আইনপ্রণেতা এখনো বলেননি, তাঁরা জেফ্রিসকে সমর্থন করবেন কি না।
আবেদনে বলা হয়েছে, ‘স্পিকারকে শুধু ডেমোক্র্যাটিক প্রতিষ্ঠানকে নয়, ডেমোক্র্যাটিক ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে।’ এতে আরও বলা হয়েছে, ‘এটি কোনো পূর্বনির্ধারিত বিষয় নয়’ এবং অন্যদেরও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটিক ককাসের ভেতরে বছরের পর বছর সম্পর্ক গড়ে তোলা জেফ্রিস এখন দলের ভেতরের একটি বড় লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন। দলের ক্রমবর্ধমান প্রগতিশীল অংশ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরও মুখোমুখি অবস্থান এবং কয়েক দশক ধরে ডেমোক্র্যাটদের সংজ্ঞায়িত করে আসা কিছু ধারণা থেকে সরে আসার চাপ দিচ্ছে।
জেফ্রিস ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ব্রুকলিনের ক্রাউন হাইটসে বড় হয়েছেন। সে সময় এলাকাটি ক্র্যাক কোকেন মহামারির সঙ্গে লড়ছিল।
২০১৯ সালে এনওয়াইইউ ল’কে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যে সম্প্রদায়ে বড় হয়েছি, সেখানে অনেক কর্মহীনতা ও যন্ত্রণা ছিল, তবে পরিবার, বন্ধু ও সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকে অনেক ভালোবাসা ও সহমর্মিতাও ছিল।’
দুই সমাজকর্মীর ছেলে জেফ্রিস পরে আইনজীবী হন। ১৯৯২ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে রডনি কিং নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনায় চার শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা খালাস পাওয়ার পর সেখানে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে — এই ঘটনা তাঁকে আইন পেশায় আসতে অনুপ্রাণিত করে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তাঁর ভাষায়, ওই ঘটনা ‘স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে সামাজিক ও জাতিগত অবিচার দূর করতে আমাদের এখনো অনেক দূর যেতে হবে।’
জেফ্রিস প্রথমে করপোরেট আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন। পরে রাজনীতিতে এসে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির নির্বাচনে দুবার হেরে ২০০৬ সালে আসনটি জেতেন এবং ছয় বছর পর কংগ্রেসে নির্বাচিত হন।
ওয়াশিংটনে তিনি ২০১৮ সালে ট্রাম্পের স্বাক্ষর করা দ্বিদলীয় ফৌজদারি বিচার সংস্কার আইন প্রণয়নে মধ্যস্থতা করেন। দুই বছর পর ট্রাম্পের প্রথম অভিশংসন বিচারে তিনি সাতজন হাউস অভিশংসন ব্যবস্থাপকের একজন হিসেবে সিনেটে ট্রাম্পকে অপসারণের পক্ষে যুক্তি দেন।
ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্বে দ্রুত উঠে এসে জেফ্রিস ২০১৯ সালে ককাস চেয়ার হন। তিন বছর পর তিনি সর্বসম্মতভাবে সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির স্থলাভিষিক্ত হয়ে দলের হাউস নেতা নির্বাচিত হন — কংগ্রেসের কোনো কক্ষে কোনো দলের নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাজনীতিবিদ।
জেফ্রিস ও পেলোসির নেতৃত্বের ধরনের তুলনা করা হয়। পেলোসি তাঁর শক্ত, উপর থেকে নিয়ন্ত্রণমূলক ধারার জন্য পরিচিত ছিলেন, আর জেফ্রিস চুপচাপ ও ধীরে ধীরে ঐকমত্য গড়ে তোলার খ্যাতি অর্জন করেছেন।
এই ধারা কিছু ডেমোক্র্যাটকে হতাশ করেছে। তাঁদের অভিযোগ, জেফ্রিস দৃঢ় অবস্থান নিতে বেশি দ্বিধা করেন এবং ট্রাম্প ও কংগ্রেসের রিপাবলিকানদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য তিনি যথেষ্ট প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নির্বাচনের পর জেফ্রিস ঘোষণা করেন, ‘আমেরিকার মানুষ প্রতিশোধ চায় না; তারা চায় আমরা তাদের পক্ষে কাজ করি।’ এ নিয়ে বামপন্থী রাজনৈতিক ভাষ্যকার হাসান পাইকার তাঁর মন্তব্যের ভিডিও শেয়ার করে লেখেন, ‘না, আমরা অবশ্যই ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি চাই।’
আগস্টে খবর আসে, জেফ্রিস ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে দেখা করেছেন। কুশনারের প্রশাসনে কোনো আনুষ্ঠানিক পদ নেই, তবে তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া বিষয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় জড়িত রয়েছেন।
জেফ্রিস ওই বৈঠকের পক্ষে বলেন, কুশনারই বৈঠকের অনুরোধ করেছিলেন এবং তিনি সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে সমালোচকদের যুক্তি, ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার বদলে কুশনারের ব্যবসায়িক লেনদেন তদন্তের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল।


