‘উগ্রপন্থি’ নাকি ‘নায়ক’? ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাম নেতা মেলঁশঁ নিয়ে বিতর্ক
ফ্রান্সের কট্টর বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশঁকে ডানপন্থী বিরোধীরা ‘উগ্রপন্থী’ বলেছেন, সাবেক মিত্ররা ‘স্বৈরাচারী’ বলেছেন, আর দেশব্যাপী বিক্ষোভে রাস্তায় নামা কিছু শিক্ষার্থী তাঁকে ‘নায়ক’ বলছেন। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি এখন বামপন্থীদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী এবং কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি নেত্রী মারিন ল্য পেনের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী।
ফ্রান্স আনবাউড (এলএফআই) দলের নেতা মেলঁশঁ শনিবার প্যারিসের উত্তরে ল্য বুর্জেতে এক সমাবেশে তাঁর কর্মসূচি উপস্থাপন করছেন — কর্মসূচিটি অনলাইনে প্রকাশের একদিন পর।
তাঁর প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে অবসরের বয়স ৬০-এ নামিয়ে আনা এবং ন্যূনতম মজুরি মাসে এক হাজার ৭০০ ইউরো (প্রায় এক হাজার ৯০০ ডলার) করা; ফ্রান্সকে ন্যাটো থেকে বের করে আনা এবং অর্থনীতির কিছু অংশ পুনরায় রাষ্ট্রীয়করণ করা।
তিনি চান ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফ্রান্সের কাছে থাকা ঋণ পরিশোধ বন্ধ করুক — কার্যত ঋণটিকে স্থায়ী সুদমুক্ত ঋণে রূপান্তরিত করুক। এতে সরকারের ব্যয়ের সুযোগ বাড়বে বলে তিনি আশা করেন।
ইউরোপ প্রসঙ্গে তিনি চান ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকুক, তবে দেশের সামাজিক, পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নিয়ম মানতে অস্বীকার করুক — যা ব্রাসেলসের সঙ্গে মুখোমুখি সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ব্যর্থ সরকারি সেবা, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষুব্ধ বিভিন্ন গোষ্ঠী যোগ দেওয়ায় তাঁর দল গতি পাচ্ছে।
কট্টর বাম নেতাকে মিছিলগুলোতে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে স্বাগত জানানো হয়েছে, যদিও কিছু মিছিলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে।
গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক জাক রেলাঁ বলেন, ‘তাঁর শক্তি হলো তিনি বিক্ষোভের দাবিগুলোর সঙ্গে সুর মিলিয়ে চলছেন: ভালো মজুরি, শিক্ষায় অর্থ, অনেক কল্যাণমূলক ব্যবস্থা, কৃচ্ছ্রতা কাটছাঁট নয় — যা জীবনযাত্রার ব্যয়ে বিরক্ত মানুষকে সান্ত্বনা দেয়। তিনি বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠস্বর।’
তবে কেউ কেউ বলছেন, তাঁর নীতিমালা উগ্র ও অবাস্তব।
ফ্রান্সের অর্থ ও ঋণ নিবিড় নজরদারিতে রয়েছে, কারণ দেশটির বাজেট ঘাটতি ও ঋণের মাত্রা বেশি। এতে তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যয় পরিকল্পনা — বিশেষ করে সামাজিক কর্মসূচি ও সরকারি বিনিয়োগ — কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়ছে।
কিছু অর্থনীতিবিদ সতর্ক করেছেন, তাঁর পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের ফরাসি সরকারি বন্ড বিক্রি করতে বাধ্য করতে পারে, যা ফ্রান্সের জন্য ঋণ নেওয়া আরও ব্যয়বহুল করে তুলবে এবং ক্ষতির কারণ হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সেপ্টেম্বরে এ ধরনের প্রস্তাব প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঋণ নিয়ে সেটা ফেরত না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া — একে চুরি বলে।’
এলএফআই বলছে, ধনী ব্যক্তি ও বড় করপোরেশনের ওপর উচ্চ কর আরোপ করে তাদের ব্যয় পরিকল্পনার অর্থ জোগানো হবে।
তাঁর প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে ধনকুবেরদের সম্পদের ওপর ন্যূনতম দুই শতাংশ কর, ফ্রান্সের সম্পদ কর পুনরায় চালু করা এবং বড় উত্তরাধিকারের ওপর কর বাড়ানো।
অক্টোবরে মেলঁশঁ বলেন, ‘আর্থিক পুঁজি উপকৃত হয়েছে, এবং সেটাই মূল্য দেবে।’
তাঁর কর্মসূচি বামপন্থী অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপের ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়া, যার আংশিক শিকড় কেইনসীয় চিন্তায় — যেখানে বলা হয়, বাজার-সৃষ্ট বৈষম্য কমাতে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা থাকা উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইউপিইসি-প্যারি বারো বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি আইনের অধ্যাপক বেলিগ নাবলি বলেন, ‘যেহেতু অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের এই ঐতিহ্য অন্য বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল পরিত্যাগ করেছে, তাই এলএফআইয়ের এভাবে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করা উগ্রপন্থার ধারণা তৈরি করে। কিন্তু এই উগ্রপন্থা কেবল আপেক্ষিক — অন্যান্য সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রস্তাবের তুলনায় এটি উগ্র মনে হয়, কিন্তু সামাজিক গণতন্ত্রের ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি মোটেও উগ্র নয়।’
৭৫ বছর বয়সী মেলঁশঁ মরক্কোতে ফরাসি বাবা-মায়ের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। শিশু অবস্থায় তিনি ফ্রান্সে চলে আসেন এবং পরে দর্শন ও আধুনিক সাহিত্যে স্নাতক হন। ১৯৮০-এর দশকে তিনি সোশ্যালিস্ট পার্টিতে যোগ দেন, তবে দলটি উদার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়লে তিনি নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন।
২০০৮ সালে তিনি সোশ্যালিস্টদের ছেড়ে লেফট পার্টি গড়েন, যা পরে এলএফআইয়ে রূপ নেয়। দলটি শ্রমজীবী ভোটার ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন তৈরি করে এবং তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়।
এই সপ্তাহের জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মেলঁশঁ এখন বামপন্থীদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে — এবং ফ্রান্সের রাজনীতিতে তাঁকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে।



