একক বাজারে ফিরতে চাইলে যুক্তরাজ্যকে সব শর্ত মানতে হবে, বার্নিয়ারের সতর্কবার্তা

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক ব্রেক্সিট আলোচক মিশেল বার্নিয়ে সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাজ্য একক বাজারের সুবিধাগুলোর মধ্যে থেকে বেছে বেছে নিতে পারবে না। বিবিসির 'সানডে উইথ লরা কুয়েন্সবার্গ' অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, একক বাজারের কোনো 'আ লা কার্তে' তালিকা নেই, যেখান থেকে যুক্তরাজ্য নিজের পছন্দমতো অংশ বেছে নেবে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে তিনি যেসব বিকল্প ভাবছেন, তার মধ্যে ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বাজারে ফেরা অন্যতম। জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে বার্নহ্যাম ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি লেবার পার্টিকে ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকে, এমনকি পূর্ণ সদস্য হিসেবে ফেরার দিকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতে পারেন। তবে পরবর্তী নির্বাচনের আগে বড় কোনো পরিবর্তন না করার কথাও তিনি বলেছেন।
বার্নিয়ে বলেন, ইউরোপের ভেতরে যুক্তরাজ্যের পূর্ণ সদস্য হিসেবে ফেরার দরজা খোলা আছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, একক বাজারে ফেরার যেকোনো পদক্ষেপের জন্য যুক্তরাজ্যকে অন্য সদস্যদের মতো একই শর্ত মানতে হবে।
বার্নিয়ে আরও বলেন, এর মধ্যে রয়েছে পণ্য, সেবা, মূলধন ও মানুষের চলাচলকে উৎসাহিত করার জন্য তৈরি নিয়মগুলো মেনে চলা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠানগুলোতে এগুলোকে একসঙ্গে 'চার স্বাধীনতা' বলা হয়। তাঁর ভাষায়, 'একটি স্বাধীনতা নিয়ে অন্যটি না নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। চার স্বাধীনতাই স্পষ্টত একক বাজারের ভেতরে থাকার চারটি শর্ত।'
একক বাজার এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই পণ্য অবাধে বাণিজ্য করা যায়। ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ব্রেক্সিট আলোচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া বার্নিয়ে ২০২৪ সালে তিন মাস ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন।
চার স্বাধীনতার মধ্যে মানুষের অবাধ চলাচল—যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের ভিসা ছাড়া অন্য সদস্য দেশে বসবাস ও কাজের সুযোগ দেয়—২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের সময় অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল। বার্নহ্যামের পূর্বসূরি স্যার কিয়ার স্টারমার লেবার পার্টির ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে এটি পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি বাতিল করেছিলেন। ভবিষ্যতের কোনো নির্বাচনে এ বিষয়ে আবার অবস্থান নেওয়া কনজারভেটিভ ও রিফর্ম ইউকের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাজনের রেখা হয়ে উঠবে।
বার্নহ্যাম সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, গণভোট ছাড়া তিনি মানুষের অবাধ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন না। এরপর ডাউনিং স্ট্রিট স্পষ্ট করে জানায়, এই মুহূর্তে তিনি এটি ফিরিয়ে আনার পক্ষে কথা বলছেন না।
বার্নহ্যাম এর আগে বলেছিলেন, চলতি মাসের শেষের দিকে ব্রাসেলস শীর্ষ সম্মেলনে তিনি সম্পর্কের 'বিভিন্ন বিকল্প' তুলে ধরতে চান, তারপর ব্রিটিশ জনগণের সঙ্গে একটি নতুন সম্পর্কের বিষয়ে ঐকমত্য খোঁজার চেষ্টা করবেন।
দুই পক্ষই আশা করছে, দশ দিন পর ব্রাসেলসে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে খাদ্য মান, যুব ভিসা এবং ব্রিটিশ শিল্পকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করার বিষয়ে চুক্তি ঘোষণা করা হবে। এর আগে তাঁর পূর্বসূরিরা ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পারস্পরিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে একাধিক চুক্তি করেছেন।
বার্নিয়ে আরও ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো ব্রিটিশ আর্থিক ছাড় পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবে। ১৯৮৫ সালে আলোচনার মাধ্যমে পাওয়া ওই ছাড় যুক্তরাজ্য সদস্য থাকাকালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বার্ষিক বাজেটে তার অবদান কমিয়েছিল। বার্নিয়ের ভাষায়, যুক্তরাজ্যের চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত 'একটি নতুন পরিস্থিতি' তৈরি করেছে, তাই নতুন ছাড় 'আলোচনার বাইরে'।
বার্নিয়ে রিফর্ম নেতা নাইজেল ফারাজের সঙ্গে ফরাসি রাজনীতিক মেরিন ল্য পেনের তুলনা করেন। তিনি বলেন, 'আমাদের নিজেদের ফারাজ আছেন। তিনি মিসেস ল্য পেন। একই জনপ্রিয়তাবাদ, একই মিথ্যা, একই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি।' মিথ্যার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বার্নিয়ে বলেন, উদাহরণস্বরূপ, ফারাজ ও জনসন যখন যুক্তরাজ্যের জনগণকে প্রতি সপ্তাহে ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, 'তা সত্য ছিল না, তা সম্ভব ছিল না। এটি ছিল মিথ্যা।'
ভোট লিভ প্রচারের বাসের গায়ে লেখা স্লোগানে বলা হয়েছিল, ব্রিটেন প্রতি সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড পাঠায় এবং 'চলুন এর পরিবর্তে আমাদের এনএইচএসে অর্থায়ন করি'। বরিস জনসন ২০১৭ সালে বলেছিলেন, হিসাব মিটিয়ে নেওয়ার পর প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড ফেরত নেওয়া যাবে। সমালোচকরা বলেছেন, এই অঙ্কটি ছিল মোট অবদানের আনুমানিক হিসাব, যেখানে প্রতি সপ্তাহে ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ডের ছাড় কিংবা যুক্তরাজ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিনিয়োগ ধরা হয়নি। জনসন পরে তাঁর ২০২৪ সালের স্মৃতিকথায় এই দাবির পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন।
ফারাজ এর জবাবে বলেন, 'সেই একই পুরনো বার্নিয়ে—অহংকারী, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং একজন উৎপীড়ক। তিনি মুখ খোলার প্রতিবারই আমাদের চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করেন।' ফারাজ লিভ.ইইউর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং ভোট লিভ প্রচারের অংশ ছিলেন না, তাই ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের দাবির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না।



